শিরোনামঃ

পাথরে খোদাই করা প্রতিবাদ: খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুক্তিযুদ্ধের ভাষা ‘অদম্য বাংলা


খুবি প্রতিনিধি: সৈয়দ জাওয়াদ হোসেন সামি


কেউ কথা না বলেও ইতিহাস বলতে পারে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রস্থলে দাঁড়িয়ে থাকা ‘অদম্য বাংলা’ ভাস্কর্য ঠিক তেমনই এক নীরব বক্তা। শব্দহীন এই শিল্পকর্ম অস্ত্র হাতে সংগ্রামে নামা একটি জাতির গল্প বলে—যে জাতি দমে যায়নি, মাথা নত করেনি, বরং রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার মূল্য চুকিয়েছে। তাই এটি শুধু ভাস্কর্য নয়, এটি মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্যমান ভাষ্য।

২৩ ফুট উঁচু বেদির ওপর দৃঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজন পুরুষ মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁদের পাশে সমান প্রত্যয়ে অবস্থান নেওয়া এক সংগ্রামী নারী ১৯৭১ সালের সম্মিলিত প্রতিরোধের প্রতীক। এখানে কোনো একক বীর নেই, আছে একটি জাতির সম্মিলিত দাঁড়িয়ে যাওয়ার দৃশ্য। ভাস্কর্যের এই বিন্যাসই বলে দেয়—মুক্তিযুদ্ধ ছিল সর্বস্তরের মানুষের যুদ্ধ।

ভাস্কর্যের প্রতিটি অবয়বে ফুটে উঠেছে স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন মনোভাব। বিশেষভাবে নারীর উপস্থিতি মুক্তিযুদ্ধে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসে, যা অনেক সময় মূল আলোচনার আড়ালে থেকে যায়। মা-বোন, শিক্ষার্থী, কৃষক, শ্রমিক—সবার ত্যাগেই যে স্বাধীন বাংলাদেশ, ‘অদম্য বাংলা’ সেই সত্যকে দৃঢ়ভাবে স্মরণ করিয়ে দেয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার পর সাধারণ মানুষ যেভাবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে প্রতিরোধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, এই ভাস্কর্য সেই সময়ের চেতনাকেই রূপ দিয়েছে শিল্পে। কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছে, কেউ আশ্রয় দিয়েছে, কেউ চিকিৎসা ও খাদ্যের ব্যবস্থা করেছে—এই সম্মিলিত প্রতিরোধের ফলেই আসে ১৬ ডিসেম্বরের বিজয়। ‘অদম্য বাংলা’ সেই দীর্ঘ সংগ্রামের এক স্থায়ী প্রতীক।

স্থপতি গোপাল চন্দ্র পালের নকশায় নির্মিত এই ভাস্কর্যের নামকরণ করা হয় ‘অদম্য বাংলা’। তাঁর প্রস্তাবের ভিত্তিতে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের ১৫৬তম অধিবেশনে নামটি চূড়ান্ত হয়। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠনের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। ২০১১ সালে প্রায় ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ২০১২ সালের জানুয়ারিতে শেষ হয়। চূড়ান্তভাবে ভাস্কর্য নির্মাণে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ৪২ লাখ টাকা। একই বছর এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রায় ২১ বছর পর নির্মিত এই ভাস্কর্য এখন ক্যাম্পাসের অন্যতম প্রধান ল্যান্ডমার্ক।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ‘অদম্য বাংলা’ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক ও জাতীয় চর্চার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মহান স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবসসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও সাংস্কৃতিক কর্মসূচিতে এই ভাস্কর্য ঘিরেই গড়ে ওঠে সমাবেশ। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য এটি হয়ে ওঠে ইতিহাস জানার প্রথম পাঠ, আর শিক্ষকদের জন্য দায়িত্বের স্মারক।

এক শিক্ষার্থী বলেন, “এই ভাস্কর্যের সামনে দাঁড়ালে মুক্তিযুদ্ধ বইয়ের বিষয় থাকে না, বাস্তব মনে হয়। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বাধীনতা পাওয়া যতটা কঠিন ছিল, রক্ষা করাও ততটাই জরুরি।”

স্থাপত্যগত দিক থেকেও ‘অদম্য বাংলা’ তাৎপর্যপূর্ণ। খোলা আকাশের নিচে ভাস্কর্যটির অবস্থান প্রতীকী—যেন স্বাধীনতার চেতনা কোনো ছাদের নিচে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখায়, মুক্তিযুদ্ধ কেবল অতীত নয়; এটি চলমান দায়িত্ব।

পাথর, কংক্রিট আর নকশার বাইরেও ‘অদম্য বাংলা’ এক শক্ত বার্তা দেয়—স্বাধীনতা কোনো অনুদান নয়, এটি অর্জিত। আর সেই অর্জন টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন অদম্য মানসিকতা, ঠিক যেমনটি ধারণ করে আছে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ভাস্কর্য।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?