শিরোনামঃ

কটকা স্মৃতিস্তম্ভ: যেখানে পাথরের গায়ে লেখা আছে



খুবি প্রতিনিধি : সৈয়দ জাওয়াদ হোসেন সামি 


 এক প্রজন্মের শোক

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে থাকা কটকা স্মৃতিস্তম্ভটি প্রথম দেখায় নীরব। কোনো শব্দ নেই, কোনো উচ্চারণ নেই—তবু এটি কথা বলে। যারা জানে, তাদের কাছে এটি কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি সময়ের সঙ্গে জমে ওঠা শোক, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর একটি দিনের অসমাপ্ত গল্পের নীরব দলিল।

এই স্মৃতিস্তম্ভ আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় ২০০৪ সালের ১৩ মার্চে—যে দিনটি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে চিরতরে কালো অক্ষরে লেখা হয়ে আছে।

স্মৃতিস্তম্ভের পেছনের সেই দিন

সুন্দরবনের কটকা তখন ছিল তরুণদের কাছে মুক্তির এক নাম। শহরের বাঁধাধরা নিয়ম, একাডেমিক ব্যস্ততা আর ক্লান্তির বাইরে প্রকৃতির কোলে কিছুটা সময় কাটানোর সুযোগ। সমুদ্র তখন ভয় নয়, ছিল আনন্দের প্রতিশ্রুতি।

বল খেলায় ব্যস্ত কেউ, কেউ গোসলে। বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কেউ আবার শুরু করে দেয় সাঁতারের প্রতিযোগিতা। নোনা পানির স্পর্শে উচ্ছ্বাস বাড়তে থাকে। চারপাশ মুখরিত হয়ে ওঠে হাসি আর কলরবে। তখনো কারও মনে আসন্ন বিপদের লেশমাত্র পূর্বাভাস নেই। নেই কোনো নিষেধ, নেই কোনো কৈফিয়তের ভয়। প্রকৃতির মাঝে এসে তারা যেন ফিরে পেয়েছিল তাদের হারানো স্বাধীনতা।

কিন্তু সেই স্বাধীনতাই যে অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের সামনে মহাকালের নির্মম রূপ নিয়ে দাঁড়াবে—তা কেউ বুঝতে পারেনি। যে সমুদ্র ছিল আনন্দের সাক্ষী, মুহূর্তেই সে হয়ে ওঠে নিঃশব্দ মৃত্যুর বাহক। সময় থেমে যায়। থেমে যায় স্বপ্ন, সম্ভাবনা আর একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ।

যে নামগুলো পাথরে খোদাই হয়ে আছে

সেই মর্মান্তিক ঘটনায় প্রাণ হারান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের ৯ জন মেধাবী শিক্ষার্থী—

তৌহিদুল এনাম (অপু),

আব্দুল্লাহ হেল বাকী,

মো. মাহমুদুর রহমান (রাসেল),

কাজী মুয়ীদ ওয়ালি (কুশল),

মো. আশরাফুজ্জামান (তোহা),

আরনাজ রিফাত (রূপা),

মাকসুমুল আজিজ মোস্তানী (নিপুণ),

মোহাম্মদ কাউছার আহমেদ খান,

মুনাদিল রায়হান বিন মাহবুব (শুভ)।

এ ছাড়া বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রকৌশল বিভাগের দুই শিক্ষার্থী— শামসুল আরেফিন শাকিল ও সামিউল হাসান খানও সেদিন সমুদ্রের বুকে হারিয়ে যান।

এই নামগুলো আজ কটকা স্মৃতিস্তম্ভের পাথরে খোদাই হয়ে আছে—কেবল পরিচয়ের জন্য নয়, স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য। যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বুঝতে পারে, এই নীরব সৌধের পেছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ইতিহাস, এক অপূরণীয় ক্ষতি।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?