ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান: একটি অবিনাশী ইশতেহার ও আমাদের গণতান্ত্রিক দায়

​📌ইতিহাস কোনো মৃত স্তূপ নয়, বরং এটি এক জীবন্ত বারুদশালা যা অন্যায়ের স্পর্শে যেকোনো সময় জ্বলে উঠতে পারে। ইতিহাসের কিছু বাঁক থাকে যা স্রেফ ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে দেওয়ার মতো নয়, বরং তা একটি জাতির সমষ্টিগত চেতনার খোলস ভেঙে বের হয়ে আসার মুহূর্ত। ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে তেমনি এক ‘মহাবিস্ফোটের’ দিন। আজ যখন আমরা ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের সাতান্নতম বর্ষে দাঁড়াই, তখন এটি কেবল একটি আনুষ্ঠানিক স্মৃতিচারণ নয়; বরং আমাদের গণতান্ত্রিক অস্তিত্বের এক নির্মোহ ময়নাতদন্তের দাবি রাখে। আইয়ুব খান যখন তাঁর শাসনের ‘উন্নয়নের দশক’ উদযাপন করছিলেন, তখন রাজপথের এই গণবিস্ফোরণ বিশ্বকে এক ধ্রুব সত্য শিখিয়েছিল—ভঙ্গুর গণতন্ত্র আর নাগরিক অধিকার হরণ করে কেবল মেকি ‘উন্নয়নের’ সৌধ নির্মাণ করলে তা বালুর বাঁধের মতো ধসে পড়ে। এটি ছিল ক্ষমতার সেই ঐতিহাসিক বৈপরীত্য, যেখানে শাসকের উন্নয়নের দম্ভ শোষিত মানুষের অধিকারের কাছে পরাজিত হয়েছিল।


​ঊনসত্তরের এই অভ্যুত্থান কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটি ছিল বিশ শতকের সেই উত্তাল ষাটের দশকেরই একটি অবিনাশী অংশ, যখন মুক্তির এক পাক্ষিক আবহাওয়া বিশ্বজুড়ে তারুণ্যের বুকে আছড়ে পড়ছিল। ১৯৬৮-র মে মাসে ফ্রান্সের প্যারিসে ছাত্ররা যখন পুঁজিবাদী ও ঔপনিবেশিক সমাজকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের দাবিতে রাজপথ দখল করেছিল, কিংবা চেকোস্লোভাকিয়ার ‘প্রাগ স্প্রিং’ যখন মানবিক সমাজতন্ত্রের নেশায় সোভিয়েত ইউনিয়নের লৌহমানবের চোখ রাঙানি উপেক্ষা করছিল—ঠিক সেই বৈশ্বিক মুক্তির নেশার এক অপরাজেয় ‘বাঙালি সংস্করণ’ ছিল আমাদের ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান। প্যারিসের রাজপথে ছাত্র-শ্রমিকদের সেই ‘বিদ্রোহের বসন্ত’ কিংবা ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমেরিকার তারুণ্যের যে চিৎকার, তারই প্রদীপ্ত প্রতিধ্বনি ছিল ঢাকার রাজপথের প্রতিটি স্লোগান। তৎকালীন স্নায়ুযুদ্ধের সেই স্নায়বিক টানাপোড়েনের যুগে মার্কিন মদদপুষ্ট আইয়ুবীয় একনায়কতন্ত্রের পতন কেবল অভ্যন্তরীণ বিষয় ছিল না; এটি ছিল মার্টিন লুথার কিং-এর নাগরিক অধিকার আন্দোলন থেকে শুরু করে বিশ্বজনীন শোষিত মানুষের জেগে ওঠার এক অভিন্ন মহাকাব্য।


​এই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষোভের মূলে ছিল পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে আকাশচুম্বী অর্থনৈতিক বৈষম্য। ৬-দফা ছিল বাঙালির সেই বঞ্চনা মুক্তির ঐতিহাসিক সনদ। পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের চাকা যখন পূর্ব বাংলার ঘাম ও মেহনতে সচল থাকছিল, তখন এদেশের মানুষ পাচ্ছিল কেবল অবজ্ঞা আর বঞ্চনা। এই 'দুই অর্থনীতি'র তত্ত্ব এবং শোষণের পরিসংখ্যানই ছিল গণ-অভ্যুত্থানের আসল চালিকাশক্তি। ৬-দফার সেই স্বাধিকার চেতনা যখন ছাত্রদের ১১-দফার সাথে একীভূত হলো, তখনই তা প্রকৃত অর্থে একটি ‘গণ-আন্দোলনের’ রূপ পেল। ২০ জানুয়ারি ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামানের আত্মদানের পর যখন তাঁর রক্তাক্ত শার্টটি লাঠির আগায় গেঁথে মিছিল বেরিয়েছিল, সেটি স্রেফ একটি কাপড় ছিল না; সেটি ছিল বাঙালির রাজনৈতিক কাফন ও বিজয়ের প্রথম রক্তিম ইশতেহার। আসাদের সেই শার্ট ছিল একটি স্বাধীন জাতির ‘জন্মসনদ’। ২১ থেকে ২৩ জানুয়ারির সেই স্তব্ধ শোক ২৪ জানুয়ারিতে এক অদম্য গণ-জোয়ারে পরিণত হয়।


​ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি কেবল ক্যালেন্ডারের কোনো সাধারণ সংখ্যা ছিল না; এটি ছিল বাঙালির রুদ্ধ আক্রোশের এক কালবৈশাখী, যা দীর্ঘদিনের দাসত্বের নিস্তব্ধতা ভেঙে নেমে আসা এক আদিম বজ্রপাত। সেই ভোর থেকেই সান্ধ্য আইন উপেক্ষা করে ঢাকার অলিতে-গলি থেকে ছোট ছোট মিছিল এসে মিশেছিল এক বিশাল জনসমুদ্রে। লাঠি-সোটা আর মরণপণ স্লোগান বুকে নিয়ে লাখো মানুষ যখন সচিবালয় অভিমুখে যাত্রা শুরু করে, তখন ঢাকা হয়ে ওঠে এক অবরুদ্ধ নগরী। রাজপথের প্রতিটি ইঞ্চি প্রকম্পিত হচ্ছিল ‘আইয়ুব শাহীর পতন চাই’ স্লোগানে। ঠিক সেই অগ্নিঝরা মুহূর্তে, সচিবালয়ের সামনে যখন পুলিশ নির্বিচারে গুলি বর্ষণ শুরু করে, তখন নবকুমার ইনস্টিটিউটের নবম শ্রেণির কিশোর মতিউর রহমান হাতে পোস্টার নিয়ে মিছিলের একেবারে অগ্রভাগে। বুলেটের সামনে বুক পেতে দেওয়ার সেই দৃশ্য কেবল অদম্য সাহস নয়, তা ছিল একটি জাতির ভবিষ্যৎ মানচিত্র আঁকার তেজ। পুলিশের গুলিতে কেবল কিশোর মতিউরই নন, রাজপথ রঞ্জিত হয় শ্রমিক রুস্তম আলী, মকবুল ও আনোয়ারের মতো সাধারণ মানুষের রক্তে। মতিউরের রক্তভেজা নিথর দেহটি যখন বড়দের কাঁধে তুলে নেওয়া হলো, তখন ঢাকার রাজপথ রোদন নয়, বরং রুদ্রমূর্তিতে ফেটে পড়েছিল। মানুষের ক্রোধের আগুনে সেদিন সরকারি ভবন আর আইয়ুবপন্থী সংবাদপত্র ‘দৈনিক পাকিস্তান’ ও ‘মর্নিং নিউজ’-এর দপ্তর ভস্মীভূত হয়ে গিয়েছিল। মতিউর ও রুস্তমদের রক্তে ভেজা সেই বিকেলটিই মূলত বাঙালির ভাগ্যলিপি চিরতরে বদলে দিয়েছিল।


​২৪ জানুয়ারির এই বিস্ফোরণ পুরো দেশজুড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনের এই অপ্রতিরোধ্য গতির মুখে ১৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা সেনানিবাসে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অভিযুক্ত সার্জেন্ট জহুরুল হককে নির্মমভাবে হত্যা করা হলে বাঙালির ক্রোধ আগ্নেয়গিরিতে রূপ নেয়। জহুরুল হকের শাহাদাত বাঙালির আইনি লড়াইকে চূড়ান্ত রাজপথের যুদ্ধে রূপান্তরিত করেছিল। আন্দোলনের এই চরম শিখরে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. শামসুজ্জোহার আত্মদান ছিল মূলত ‘জ্ঞানের প্রদীপ দিয়ে অন্ধকারের দেয়াল ভাঙার’ প্রথম সরাসরি আঘাত। ছাত্রদের বাঁচাতে নিজের বুক পেতে দিয়ে ড. জোহার সেই মহান ত্যাগ আজও আমাদের শিক্ষকতার চরম নৈতিক সীমানা মনে করিয়ে দেয়। এই আন্দোলনের অনন্য শক্তি ছিল এর সাংস্কৃতিক আভিজাত্য এবং তৃণমূলের সংহতি। ‘জাগো জাগো বাঙালি জাগো’ স্লোগান যখন মওলানা ভাসানীর ‘খামোশ’ এবং ‘ঘেরাও’ আন্দোলনের বজ্রধ্বনির সাথে মিলল, তখন আইয়ুব শাহীর পতন হয়ে পড়ল অনিবার্য। শেখ মুজিবুর রহমান জেলমুক্ত হয়ে বাঙালির অবিসংবাদিত 'ত্রাতা' হিসেবে আবির্ভূত হলেন।


​আজ ৫৭ বছর পর সেই মহাবিস্ফোরণের স্মৃতি কি কেবল ইতিহাসের এক ধূসর শিলালিপি? আজকের এই নব্য-উদারবাদী বৈষম্য আর বুদ্ধিবৃত্তিক আপসকামিতার কালে ঊনসত্তরের সেই অবিনাশী দ্রোহ যেন আমাদের এক তীব্র নৈতিক কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। আসাদের রক্তাক্ত শার্ট আজ কেবল জাদুঘরের কোনো বস্তু নয়, বরং তা এক নীরব শাসন—যা আমাদের প্রতিদিনের ভীরুতাকে ধিক্কার জানায়। মতিউরের সেই পবিত্র রক্ত আমাদের অস্তিত্বের শিকড়ে এক কম্পন তৈরি করে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি পেরেছি সেই কিশোরের স্বপ্নের মানচিত্রকে এক ইঞ্চিও স্পর্শ করতে? যে ৬-দফা ও ১১-দফা একদা একটি জাতির ভাগ্যরেখা বদলে দিয়েছিল, আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির চাকচিক্যে ঘেরা তারুণ্যের কাছে কি তেমন কোনো সামষ্টিক ইশতেহার আছে?


​ঊনসত্তরের ২৪ জানুয়ারি কেবল একটি দিবস নয়, এটি ছিল ১৯৭১-এর সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত সূচনাবিন্দু। এই গণ-অভ্যুত্থানই বাঙালির মনে সেই আত্মবিশ্বাস বুনে দিয়েছিল যে, সংহতি থাকলে একটি প্রশিক্ষিত সামরিক শক্তিকেও পরাস্ত করা সম্ভব। সেই রাজপথের প্রতিটি রক্তবিন্দু সেদিন আমাদের এক পরম সত্য মনে করিয়ে দিয়েছিল—১৯৫২-এর বর্ণমালা ৬৯-এর রাজপথে এসে শাণিত তরবারিতে পরিণত হয়েছে। ঊনসত্তরের চেতনা কোনো স্থির অতীত নয়, বরং এটি এক চিরন্তন প্রবহমান দাহ—যা সাম্য ও স্বাধিকারের প্রতিটি পদক্ষেপে আমাদের বিবেককে দংশন করবে। রাজপথের সেই অমর স্লোগানগুলো আজও বাতাসে মিশে আছে; আমাদের কাজ হলো কেবল কান পেতে সেই স্পন্দন শোনা এবং আসাদ-মতিউর-জহুরুল-জোহার অসমাপ্ত মুক্তির লড়াইকে বুকের পাঁজরে আগলে রাখা। ২৪ জানুয়ারির সেই কিশোর মতিউর এবং শহীদ রুস্তম-মকবুলরা আমাদের জন্য কেবল ইতিহাস নন, তাঁরা আমাদের স্বাধীনতা ও অমরত্বের এক অমলিন স্বাক্ষর।




​📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ

(কলামিস্ট, সংস্কৃতি কর্মী) 

২৪ জানুয়ারি, ২০২৬

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?