শিরোনামঃ

শিক্ষা ও সংখ্যা জ্ঞানহীন মান্তা সম্প্রদায়

সাঈদ পান্থ, বরিশাল 
তাদের জীবন সংখ্যা জ্ঞানহীন, অধিকাংশই হিসাব কষতে পারেন না, এমনকি টাকাও গুণতে পারেন না। শিশু-কিশোর-নারীরা তাদের প্রকৃত বয়স বলতে পারেন না। কেউ কেউ মোবাইলে ফোনে কল করলে পারলেও, সংখ্যা না চেনায় নম্বর শুনে মোবাইলে কল দিতে পারেন না। অক্ষর ও সংখ্যা জ্ঞানহীন হওয়ায় এ রকম এক ভীষণ সংকটে আছেন নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা মান্তা সম্প্রদায়। স্থানীয় ভাষায় তাদর বেদে বা বাইদ্যা বলা হয়। ভাসমান এই সম্প্রদায় যুগ যুগ ধরে নদীরে পাড়ে অবস্থান করে মাছ ধরে জীবিকা অর্জন করে।
সম্প্রতি সরেজমিনে বরিশাল সদর উপজেলার বুখাইনগর ও লাহারহাট এলাকায়সহ মোট ৫ ইউনিয়নে গিয়ে নদীতে অবস্থানকারী মানতা সম্প্রদায়ের প্রায় আড়াই শতাধিক নৌ-বহরের অন্তত শতাধিক সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।
দেখা গেছে নারীদের সবাই অক্ষর ও সংখ্যা জ্ঞানহীন। মাঝবয়সী নারীদের গড়ে প্রত্যেকের ৪-৫টি সন্তান আছে। কিন্তু নিজেদের বয়স, বিয়ের বয়স ও সন্তানদের বয়স কেউ বলতে পারছেন না। সবাই বাংলা ভাষায় কথা বললেও, লিখতে বা পড়তে পারে না। শিশু-কিশোররা কেউ স্কুলে পড়ে না।
মান্তা

তাদের অধিকাংশের জাতীয় পরিচয়পত্র থাকলেও, নেই জেলে কার্ড। এতে নদীতে জাল ও বড়শি দিয়ে মাছ ধরলেও, জেলেদের জন্য সরকারি সহায়তা থেকে তারা বঞ্চিত। শুধু তাই নয়, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সরকারি সব ধরনের ভাতা থেকে বঞ্চিত এই মানতা সম্প্রদায়। নগরীর সদর উপজেলার চরমোনাই ইউনিয়নের বুখাইনগরে আড়িয়াল খাঁ নদীর শাখা খালে প্রায় ৪০ বছর ধরে অবস্থান করছে মানতা সম্প্রদায়ের একটি দল। দলের সদস্য হাসিনা বেগম তার বয়স বলতে পারলেও, মোবাইল নম্বর জানেন না। তিনি শুধু কল এলে রিসিভ করতে পারেন।
তিনি জানান, এই দলে ৭০টি নৌকা আছে। গড়ে প্রতি নৌকায় ৫-৬ জন সদস্য আছেন, যাদের অর্ধেক শিশু-কিশোর। প্রায় ২০০ শিশু-কিশোরের কেউ স্কুলে পড়ে না।
হাসিনা বলেন, ‘এই দলের দুই একজন নাম লিখতে পারি, সই করতে পারি ও টাকা গুণতে পারে। মহিলাদের কেউ টাকা গুণতে পারে না। আমাদের মধ্যে কেউ কেউ ১০০০, ৫০০, ১০০ টাকার নোট গুণতে পারে। তবে তারা আবার ১০, ২০, ৫ টাকা গুণে বলতে পারে না,’ বলেন তিনি। 
আরেকটি বহরের জেলে হালিমা জানান, বহরে ৭০ জন নারী, ৮০ জন পুরুষ ছাড়াও অন্তত ২০০ শিশু আছে। তাদের মধ্যে শুধু ৩ জন পুরুষ টাকা গুণতে পারেন ও ছোট ছোট হিসাব করতে পারেন। প্রায় প্রতিটি নৌকায় সোলার লাইট আছে। টিভি আছে অর্ধেক নৌকায়। ১০ জনের মোবাইল ফোন আছে।
হালিমা জানান, ছোটবেলা থেকেই শিশুরা মায়ের কাছ থেকে মাছ ধরতে শেখে। সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য তাদের নেই। বেশ আগে তাদের জন্য ভাসমান স্কুল ছিল। কিন্তু কিছুদিন পর তা সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। জেলে বহরের এই দলটি ছাড়াও, আড়িয়াল খাঁ নদীর মূল ধারায় চাদপুরা ইউনিয়ন সংলগ্ন স্থানে গড়ে উঠেছে ১৫০টি জেলে নৌকার বহর।



স্থানীয়ভাবে লাহারহাট নামে পরিচিত এই বহরে গিয়ে দেখা যায়, সারি সারি নৌকায় বসে কেউ জাল মেরামত করছে। জেলে নৌকায় বিয়ে উপলক্ষে মুরগীর মাংস রান্নার কাজ চলছে।এই বহরের সদস্যদের মধ্যে শুধু নেতৃস্থানীয় ৩ জন টাকা গুণতে পারেন। 
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য কার্যালয় সূত্র জানায়, বরিশাল জেলায় ১ হাজার, ভোলায় ৫৭০ জন, পটুয়াখালীতে ৩০০ জন ও ঝালকাঠিতে ৩৫ জন মান্তা জেলে আছে। তবে তারা সবাই জেলে কার্ডের আওতায় আসেনি। এর প্রধান কারণ জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকা। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলেন, ‘জেলে সহায়তার তালিকা ইউপি চেয়ারম্যান-সদস্যরা করেন বলে মৎস্য কার্যালয়ের কিছু করার থাকে না।’ অভিযান চলাকালেও মানতা সম্প্রদায়ের লোকেরা মাছ ধরে বলে তাদের ওপর সবাই অসন্তুষ্ট থাকে বলে জানান তারা।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের বিভাগীয় পরিচালক আল মামুন তালুকদার বলেন, মানতা সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে ৫০ জনকে তারা সেলাই প্রশিক্ষণ এবং ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয় মাসখানেক আগে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি তাদের নিয়ে ব্যাপক কাজ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে তাদের শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসতে হবে।’
মহিলা পরিষদ বরিশাল জেলা সভাপতি শাহ শাজেদা বলেন, ‘মান্তাদের মূল ধারায় ফিরিয়ে আনতে শিক্ষার আওতায় আনতে হবে।
মান্তা সম্প্রদায় নিয়ে কাজ করা সংগঠন রিপোর্ট একাত্তরের মিডিয়া কন্টেটলিড গৌরব কর্মকার বলেন, আমরা এনহ্যান্সিং ইনফরমেশন এন্ড ইনক্লুশন এব ফিশারফোক উইমেন, স্পেশালি দ্যা মান্থা কমিউনিটি নিয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছি। ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড এবং আর্টিকেল ১৯ এর সহোযোগিতায় ও দি ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন’র অর্থায়নে এই প্রকল্পটি চন্দ্রদ্বীপ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি, রিপোর্ট৭১ডটকম এবং সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা যৌথভাবে পরিচালনা করছে। আমরা মান্তাদের মূল ধারায় আনার বিষয়ে ইতোমধ্যে কার্যক্রম শুরু করেছি। 
বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: ইকবাল হাসান বলেন, ইতোমধ্যে আমরা সভা করে মান্তাদের বিষয়ে বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহন করেছি। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রসহ বিভিন্ন সরকারি সহযোগিতায় অর্ন্তভূক্ত করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?