শিরোনামঃ

চাইয়ে পাঙাশের নাশ : উপকূলের নদ-নদীতে ভবিষ্যতের মাছশূন্যতার নীল নকশা

বঙ্গোপসাগরের কূল ঘেঁষে পাথরঘাটা উপজেলার পদ্মা স্লুইজ এলাকা। ‌মঙ্গলবার বিকেলের ম্লান আলোয় বাঁশ আর জালে বোনা এক বিশাল কাঠামো সাগর তী‌রে দেখা যায়। দেখতে নিরীহ মনে হলেও এটি আসলে পাঙাশ মাছের বংশবিস্তারের পথে পাতা এক ভয়ংকর ফাঁদ। স্থানীয়ভাবে এর নাম 'চাঁই'।


পরিবেশকর্মী আরিফুর রহমা‌নের উদ্যো‌গে উদ্ধার করা চারটি চাঁই আসলে অনেক বড় এক সংকটের ক্ষুদ্র অংশমাত্র। কারণ এই চাই দক্ষিণাঞ্চলের নদী ও সাগরের প্রাকৃতিক প্রজননচক্রকে ঠেলে দিচ্ছে ধ্বংসের মুখে।



প‌রিবেশকর্মী আরিফুর রহমান বেশ ক‌য়েক বছর ধ‌রে কাজ ক‌রেন। মাঠ পর্যা‌য়ের সেই অ‌ভিজ্ঞতা থে‌কে তি‌নি ব‌লেন, একেকটি চাঁই তৈরিতে খরচ হয় ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা। আকারে এগুলো এত বড় যে ভেতরে ২-৩ জন মানুষ অনায়াসে ঢুকে পড়তে পারেন। 



আরিফুর রহমা‌নের তথ‌্যম‌তে, পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই নিষিদ্ধ ফাঁদ এবং এতে ব্যবহারের বিশেষ মণ্ড তৈরি করে সরবরাহ করে। শুঁটকি, খৈল, কুঁড়া, চিনি, চিড়া ও মাছের তেলের মিশ্রণে তৈরি এই মণ্ড দিয়ে প্রলুব্ধ করে নদীর ৪০ থেকে ৫০ ফুট গভীরে চাঁইগুলো পাতা হয়। 



পাথরঘাটা উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা হাসিবুল হক বলেন, মৎস্য বিভাগের অভিযান এড়াতে অসাধু জেলেরা এখন হোয়াটসঅ্যাপের লাইভ লোকেশন ব্যবহার করে একে অপরকে চাঁইয়ের অবস্থান জানিয়ে দেন, যা অভিযান পরিচালনাকে আরও কঠিন করে তুলেছে। মঙ্গলবার বিকা‌লের দি‌কে চারটি চাই স্থানীয়রা জব্ধ ক‌রে‌,  সন্ধ‌্যার দি‌কে নি‌ষিদ্ধ চাই পু‌ড়ি‌য়ে ফেলা হ‌য়ে‌ছে।



পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের বায়োলজি অ্যান্ড জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার। 

নিধনের ভয়াবহ পরিসংখ্যান

গবেষণা ও মাঠপর্যায়ের তথ্য বি‌শ্লেষণ ক‌রে রাজিব সরকার বলছেন, একেকটি চাঁইয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১২০ কেজি পাঙাশের পোনা ধরা পড়ে। পোনাগুলো এতটাই ছোট যে মাত্র ১ কেজিতে থাকে প্রায় ৪০টি পোনা। 



গবেষক অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার ভাষ্যমতে, এভাবে চলতে থাকলে মাত্র ছয় মাসেই অন্তত দুই কোটি পোনা নিধন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা দেশের পাঙাশ উৎপাদনকে নিয়ে ঠেকাবে তলানিতে।



পাঙাশ যখন ট্যাংরা


বাংলাদেশ মৎস্য শ্রমিক ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন বলেন, চাইর ফা‌দে আট‌কে পড়া এই পোনাগুলো, আকারে যা মাত্র ৩ থেকে ৭ ইঞ্চি। বাজারে কৌশলে বিক্রি হয় 'নদীর ট্যাংরা' বা 'পাঙাশ-ট্যাংরা' নামে। সাধারণ ক্রেতা কিংবা অনেক ক্ষুদ্র বিক্রেতাও এই পার্থক্য সম্পর্কে সচেতন নন। 



ব‌রিশাল পোর্টরোড়ের মৎস্য আড়তদার জহির শিকদার বলেন,

বর্তমানে বাজারে এই নিষিদ্ধ পোনা প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকায়। অথচ সরকারি বিধি অনুযায়ী প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুলাই পর্যন্ত ৩০ সেন্টিমিটারের কম দৈর্ঘ্যের পাঙাশ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।



ঝুঁকিতে থাকা প্রজননক্ষেত্র



দক্ষিণাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পয়েন্ট এখন এই চক্রের কবলে। পটুয়াখালী ও ভোলায় হাদির চর, চরগুণী, মাঝের চর, পাতার চর, চর বোরহান, চর কলমি ও চর মন্তাজসহ অন্তত ১২টি গুরুত্বপূর্ণ প্রজনন এলাকা এখন হুমকির মুখে। 



বরিশালে মেহেন্দীগঞ্জের নলবুনিয়া সংলগ্ন মেঘনা, সুগন্ধা, আড়িয়াল খাঁ, কালাবদর ও তেঁতুলিয়া নদীতেও চলছে একই তৎপরতা। বরগুনায় পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বর নদীর মোহনাও এর বাইরে নয়।


সামুদ্রিক প্রাণীবিশেষজ্ঞ ড, মো. কামরুল ইসলামের মতে, মাত্র ২০ জন জেলে দিনে কয়েক মণ পোনা ধরে ফেললেই প্রাকৃতিক প্রজনন চক্রের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যায়। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের মতে, এই ভয়ংকর পদ্ধতি বন্ধ করা গেলে নদ-নদীতে পাঙাশের প্রাচুর্য বহুগুণে বাড়ানো সম্ভব।



সাগর ও নদীর এই সম্পদ রক্ষা করতে হলে শুধু নদীতে অভিযান চালানোই যথেষ্ট নয়; বাউফলের মতো যেসব এলাকায় চাঁই তৈরি হয়, সেখানেও প্রয়োজন কঠোর নজরদারি। 'চাইয়ে পাঙাশের নাশ' রুখতে না পারলে আগামী দিনে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও জলজ জীববৈচিত্র্য পড়বে এক অপূরণীয় সংকটের মুখে। #

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?