নীরব ঘাতক ফ্যাটি লিভার: উপসর্গ ছাড়াই বাড়ছে ঝুঁকি, আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরাও
বিশ্বজুড়ে দ্রুত বাড়ছে ফ্যাটি লিভার রোগে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা। একসময় এটি শুধু স্থূল মানুষের সমস্যা বলে মনে করা হলেও বর্তমানে শিশু, কিশোর, তরুণ এমনকি স্বাভাবিক ওজনের মানুষের মধ্যেও উদ্বেগজনক হারে ছড়িয়ে পড়ছে। অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব এবং আধুনিক জীবনযাত্রার নানা পরিবর্তনের কারণে ফ্যাটি লিভার এখন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে উঠেছে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, রোগটির প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণত কোনো উপসর্গ দেখা যায় না। ফলে অনেকেই দীর্ঘদিন না জেনেই এ রোগ বহন করেন। অথচ সময়মতো শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ না করলে এটি লিভারের প্রদাহ, ফাইব্রোসিস, সিরোসিস এমনকি লিভার ক্যানসারের মতো জটিল রোগের কারণ হতে পারে।
ফ্যাটি লিভার কী?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ফ্যাটি লিভারকে বলা হয় ‘হেপাটিক স্টেটোসিস’। সাধারণত লিভারে কিছু পরিমাণ চর্বি থাকে। তবে যখন লিভারের মোট ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি চর্বি জমা হয়, তখন সেটিকে ফ্যাটি লিভার হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
এ রোগ মূলত দুই ধরনের—অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ এবং নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD)। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনো পর্যায়ে ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
কেন হয় ফ্যাটি লিভার?
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স, উচ্চ কোলেস্টেরল, অতিরিক্ত ট্রাইগ্লিসারাইড, অনিয়মিত ঘুম এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণ।
এ ছাড়া অতিরিক্ত ফাস্টফুড, প্রসেসড খাবার, কোমল পানীয় ও চিনিযুক্ত খাদ্য গ্রহণ, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের সামনে থাকা, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন, কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, দ্রুত ওজন কমানো এবং জিনগত কারণও এ রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
অধ্যাপক ডা. মো. ফারুক পাঠান বলেন, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, ওজন বৃদ্ধি এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণে ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ছে। প্রায় অর্ধেক রোগীর কোনো উপসর্গ না থাকায় একে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়।
শুধু মোটা মানুষ নয়, চিকন মানুষও আক্রান্ত হতে পারেন
ফ্যাটি লিভার নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা হলো এটি কেবল অতিরিক্ত ওজনের মানুষের রোগ। তবে চিকিৎসকদের মতে, বাস্তবে মোটা ও চিকন—উভয় ধরনের মানুষই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।
ডা. ফারিয়া আফসানা বলেন, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, ডায়াবেটিস, হরমোনজনিত সমস্যা এবং ব্যায়ামের অভাব ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে যাদের কোমরের মাপ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি, তাদের মধ্যে এ রোগের প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
শিশু-কিশোরদের মধ্যেও বাড়ছে উদ্বেগ
শুধু প্রাপ্তবয়স্ক নয়, শিশু-কিশোরদের মধ্যেও উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ফ্যাটি লিভার। বিশেষজ্ঞদের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতি ১০ জন শিশুর একজন এ রোগে আক্রান্ত। স্থূল শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। এমনকি ৯ বছর বয়স থেকেই ফ্যাটি লিভার শনাক্ত হওয়ার ঘটনা দেখা যাচ্ছে।
অধ্যাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, বর্তমানে শিশুদের মধ্যে এটি অন্যতম সাধারণ দীর্ঘমেয়াদি লিভার রোগে পরিণত হয়েছে। অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার গ্রহণ, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা স্ক্রিন ব্যবহার এবং কায়িক পরিশ্রম কমে যাওয়াই এর প্রধান কারণ।
কী কী লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুরুতে কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। এ কারণেই রোগটি দীর্ঘদিন অজানা থেকে যায়।
তবে কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, পেটের ডান পাশে ব্যথা বা অস্বস্তি, বমিভাব, ওজন কমে যাওয়া এবং লিভার এনজাইমের মাত্রা বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
রোগটি জটিল পর্যায়ে পৌঁছালে জন্ডিস, পেটে পানি জমা, পা ফুলে যাওয়া, রক্তক্ষরণ এবং লিভারের স্থায়ী ক্ষতির মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্যাটি লিভার শুধু লিভারের রোগ নয়; এটি ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগের সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত।
ডা. এ বি এম ছফিউল্লাহ বলেন, ফ্যাটি লিভার শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি করে, যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তোলে। পাশাপাশি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
কীভাবে শনাক্ত করা হয়?
ফ্যাটি লিভার শনাক্তে প্রথমে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে এএলটি (এসজিপিটি), এএসটি (এসজিওটি), বিলিরুবিন, সিরাম অ্যালবুমিন এবং লিপিড প্রোফাইল গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়ে পেটের আলট্রাসনোগ্রাফি করা হয়। আধুনিক পরীক্ষার মধ্যে ফাইব্রোস্ক্যান লিভারে চর্বির পরিমাণ ও ক্ষতির মাত্রা নির্ণয়ে অত্যন্ত কার্যকর। প্রয়োজনে সিটি স্ক্যান, এমআরআই বা লিভার বায়োপসিও করা হতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ কী?
চিকিৎসকদের মতে, ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা হলো জীবনযাত্রার পরিবর্তন। ডা. মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ওজন কমানোই এ সমস্যার মূল সমাধান। শরীরের মোট ওজনের ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারের চর্বি কমতে শুরু করে। আর ১০ শতাংশ ওজন কমানো সম্ভব হলে লিভারের প্রদাহ ও কোষের ক্ষতও অনেকাংশে ভালো হয়ে যেতে পারে।
এ কারণে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম করার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা। পাশাপাশি সুষম খাদ্য গ্রহণ, ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
প্রতিরোধেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন।
খাদ্যতালিকায় বেশি করে সবজি, ফলমূল ও প্রোটিন রাখতে হবে। কমাতে হবে অতিরিক্ত চিনি, প্রসেসড খাবার, কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার। পর্যাপ্ত পানি পান, নিয়মিত ব্যায়াম এবং প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত করা গেলে ফ্যাটি লিভার অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কিন্তু অবহেলা করলে এটি ধীরে ধীরে লিভারের স্থায়ী ক্ষতি, সিরোসিস, লিভার ফেইলিওর এবং লিভার ক্যানসারের মতো জটিল রোগে রূপ নিতে পারে। তাই বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সচেতন খাদ্যাভ্যাস এবং সক্রিয় জীবনযাপনই পারে এই নীরব ঘাতকের ঝুঁকি কমাতে।