মরা খাল পুনঃখননে বাড়বে ফসল উৎপাদন, রক্ষা পাবে জীববৈচিত্র
হাসান মাহমুদ॥ সেচ সুবিধার মাধ্যমে কৃষকদের ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র সুরক্ষার লক্ষে বরিশাল জেলার গৌরনদীতে মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখননের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এমপি উপজেলার নলচিড়া ইউনিয়নের কাপতলী ৫ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের উদ্বোধণ করেছেন। উদ্বোধনকৃত খালটি পুনঃখনন কাজ প্রায় শেষে পথে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এ উপজেলায় বিএডিসির অর্থায়নে ১ কোটি ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে মোট ৯ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ চলমান রয়েছে। অপরদিকে দুর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রণালয়ের আওতায় ২ কোটি ৪৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা ব্যয়ে উপজেলার সরিকল ও বাটাজোর এলাকার জনগুরুত্বপূর্ন ১০ কিলোমিটার খাল পুনঃখননের কাজ এগিয়ে চলছে।
এছাড়াও পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে গৌরনদী গয়নাঘাটা খালের পাঁচশ’ মিটার পুনঃখনন করা হয়েছে। তবে অবৈধ স্থাপনা, অপ্রয়োজনীয় স্লুইজগেট রেখে খনন কাজ ও বৃহৎ খালের বিঞ্চিৎ অংশ পুনঃখনন করায় সুফলতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
দুর্যোগ ও ত্রান মন্ত্রণালয়ের আওতায় পুনঃখননকৃত বাটাজোর-সরিকল ১০ কিলোমিটার খাল এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, একাধিক আধুনিক ভেক্যু মেশিন দিয়ে খাল পুনঃখননের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে। দীর্ঘ বছর পর মৃতপ্রায় খালটি পুনঃখননের দৃশ্য উপভোগ করছেন স্থানীয়রা। ইতিমধ্যে পুনঃখননের প্রায় অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে খননকৃত খালের কিছু কিছু অংশ এরইমধ্যে ভেঙ্গে পড়েছে। অপরদিকে নলচিড়া ও খাঞ্জাপুর এলাকায় বিএডিসির অর্থায়নে খাল পুনঃখননের চিত্র দেখা গেছে। দীর্ঘ বছর পর মৃতপ্রায় খালগুলো পুনঃখননের ফলে নবযৌবন ফিরে পেয়েছে।
খাল পুনঃখননে প্রতিবন্ধকতা ॥ খালগুলো পুনঃখনন করতে গিয়ে একধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে প্রকল্প বাস্তবায়ন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘবছর ধরে খালের খনন কাজ না হওয়ায় খালেরপাড় দখল করে বিভিন্ন ধরনের স্থাপনা নির্মান করে রেখেছিলো খালপাড়ের বাসিন্দারা। বর্তমানে খনন কাজ শুরু করায় অবৈধ স্থাপনা তাদের ভেঙ্গে নিতে হচ্ছে। জনগনের সম্ভাব্য ক্ষতি এড়িয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করায় খালের কিছু কিছু অংশে ডিজাউন পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।
একাধিক কৃষকরা জানান, গুরুত্বপূর্ন খালগুলো দীর্ঘ বছর যাবত খনন না করায় জোয়ারের পানি উঠা বন্ধ হয়ে মরা খালে পরিণত হয়েছিলো। বর্ষা মৌসুমে কিছু পানি থাকলেও শীতকালে খালগুলো শুকনো থাকতো। যে কারনে বোরো মৌসুমে সঠিক সময়ে ক্ষেতে পানি সরবরাহ করা যেত না। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছিলো। খাল পুনঃখনন প্রকল্পগুলো সঠিক ভাবে বাস্তবায়ন করা হলে কৃষকদের সেচ সংকট থাকবেনা। ফলে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
উপজেলা বিএডিসি’র উপসহকারী প্রকৌশলী সাহেদ আহমেদ চৌধুরী জানান, উপজেলার নলচিড়া ইউনিয়নের কাপলাতলী ৫ কিলোটিমার, কুতুবপুর স্বনির্ভর ৩ কিলোমিটার খাঞ্জাপুর ইউনিয়নের বয়সা এলাকায় ১ কিলোমিটার খাল বিএডিসি’র আওতায় টেন্ডার প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদার তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করছে। কঠোর মনিটরিংয়ের মধ্যদিয়ে কাজের প্রায় সিংহভাগ সম্পন্ন হয়েছে। খালগুলো পুনঃখনন করার ফলে নতুন করে ১ হাজার ৮ শত একর জমি সেচের আওতায় আসবে। ফলে এ উপজেলার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) খোকন চন্দ্র দাস জানিয়েছেন, চলতি অর্থবছরে কৃষি সেচ উন্নয়ন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে গৌরনদী উপজেলার সরিকল ও বাটাজোর ইউনিয়নের ২টি খালের ১০ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন চলছে। নিয়মানুযায়ী সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের প্রকল্প সভাপতি করে দুইটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ টাকা ব্যয়ে এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে খাল পুনঃখননের প্রায় ৭০ ভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। খালটি গড়ে ৫০ ফুট চওড়া ও ১৩ ফুট গভীর করে পুনঃখনন করা হচ্ছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, শতভাগ স্বচ্ছতার মধ্যদিয়ে প্রকল্প দুইটি বাস্তবায়ন করা হচেছ। খাল দুইটি পুনঃখননের ফলে দুই ইউনিয়নের শত শত একর কৃষি জমি সেচ সুবিধার আওতায় আসবে। খনন কাজ শেষে খালের পাড়ে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণ করা হবে।
গৌরনদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও পৌর প্রশাসক মো. ইব্রাহীম জানিয়েছেন, সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জলাবদ্ধতা নিরসন, কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধি সর্বোপরি গ্রামীণ অর্থনীতি চাঙ্গা করার লক্ষে সারাদেশ ব্যাপী খাল খনন কর্মসূচী গ্রহন করেছে সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় গৌরনদীতে খাল পুনঃখনন কর্মসূচী বাস্তবায়িত হচ্ছে। খালগুলো পুনঃখননের পর পরিবেশ সুরক্ষা বৃদ্ধির পাশাপাশি জীববৈচিত্র রক্ষা ও দেশীয় প্রজাতির মৎস্য প্রজনন বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ভরাট হওয়া খালগুলো খনন করায় কৃষির প্রসার যেমন ঘটবে, তেমনি কৃষকদের আর্থ-সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন হবে। তিনি আরও বলেন, গৌরনদীতে পুনঃখনন যোগ্য আরো জনগুরুত্বপূর্ন খাল রয়েছে। যেগুলো দখল-দূষনে মরে যাচ্ছে। ওই খালগুলো চিহ্নিত করে পুনঃখননের আওতায় নিয়ে আসা হবে।