শিরোনামঃ

কাগজে-কলমে ‘উকিল বাবা’, হৃদয়ে যিনি পরম অভিভাবক


নিজস্ব প্রতিবেদক বরিশাল :


নিজস্ব সন্তান একটি ছেলে। নেই কোনো মেয়ে। অথচ ১৫ মেয়ের জীবনে তিনি হয়ে উঠেছেন বাবার মতো আশ্রয়। যাদের কারও ছিল না পরিবার, কারও ছিল না মাথা গোঁজার স্থায়ী ঠিকানা। সমাজের অবহেলা আর বঞ্চনার মধ্যে বেড়ে ওঠা সেই মেয়েদের বিয়ের দায়িত্ব নিয়েছেন নিজের কাঁধে। বিয়ের আসরে হয়েছেন ‘উকিল বাবা’। তবে সেখানেই শেষ হয়নি দায়িত্ব। বিয়ের পরও খোঁজ রেখেছেন তাদের সংসারের, বিপদে ছুটে গেছেন পাশে। কারও সন্তান জন্মের সময় রক্তের ব্যবস্থা করেছেন, কারও সন্তানকে দেখতে গেছেন নানা হয়ে। এভাবেই ১৫ মেয়ের জীবনে আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের গণ্ডি পেরিয়ে সত্যিকারের বাবার জায়গা করে নিয়েছেন সাজ্জাদ পারভেজ।


একসময় যাদের জীবনে পরিবার বলতে কিছু ছিল না, সমাজের মূলধারায় যাদের ঠাঁই মেলেনি, সেই মেয়েদের কাছে সাজ্জাদ পারভেজ এখন শুধু একজন অভিভাবক নন, নির্ভরতার আরেক নাম। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৬ বছরে তিনি ১৫ জন সুবিধাবঞ্চিত ও সমাজের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন মেয়ের বিয়ের ব্যবস্থা করেছেন। প্রতিটি বিয়েতে নিজেই দায়িত্ব নিয়েছেন উকিল বাবার।


সাজ্জাদ পারভেজ দীর্ঘদিন সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে, বর্তমানে সুরক্ষা বঞ্চিত মেয়েদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটিতে ব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের অধ্যক্ষ। ওই প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের সময়ই আশ্রয়হীন ও সুবিধাবঞ্চিত মেয়েদের সঙ্গে তার আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে।


সেই সম্পর্কের সূত্রপাত ইয়াসমিনকে দিয়ে। ইয়াসমিন ও খালেকের বিয়ের দায়িত্ব নেওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয় এক ব্যতিক্রমী পথচলা। এরপর একে একে তানজিলা, রহিমা, বৃষ্টি, তামান্না, লামিয়াসহ ১৫ জন মেয়ের বিয়ের আয়োজন করেন তিনি। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় জেলা প্রশাসকসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও উপস্থিত থাকতেন। কিন্তু মেয়েদের কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল, তাদের পাশে একজন বাবার মতো মানুষকে পাওয়া।


সাধারণত বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেই অনেক সম্পর্কের দায়িত্বও যেন শেষ হয়ে যায়। কিন্তু সাজ্জাদ পারভেজের ক্ষেত্রে ঘটেছে উল্টোটা। বিয়ের পরও মেয়েদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখেছেন। তাদের সংসার কেমন চলছে, স্বামী-সন্তান নিয়ে তারা ভালো আছেন কি না, কোনো সমস্যায় পড়েছেন কি না—সবকিছুর খোঁজ নিয়েছেন। প্রয়োজনের সময় মেয়েরাও নির্দ্বিধায় ফোন করেছেন সেই উকিল বাবাকে।


সম্প্রতি তানজিলার সন্তান জন্মের সময় এমনই এক ঘটনার সাক্ষী হয়েছেন সবাই। সন্তান জন্মের সময় জরুরি ভিত্তিতে রক্তের প্রয়োজন হয় তার। রাতে খবর পেয়ে এক মুহূর্ত দেরি না করে ছুটে যান সাজ্জাদ পারভেজ। প্রয়োজনীয় রক্তের ব্যবস্থা করে দেন তিনি। আবার লামিয়ার সন্তান জন্মের খবর পেয়েও তাকে দেখতে ছুটে যান। শুধু নিজের মেয়েদের নয়, তাদের সন্তানদেরও নাতি-নাতনির মতো স্নেহ করেন তিনি।


মেয়েদের সংসার যেন সুন্দরভাবে এগিয়ে চলে, সে বিষয়েও তার চেষ্টা থেমে থাকেনি। মেয়েদের স্বামীদের স্বাবলম্বী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। তার প্রত্যাশা, একসময় যেসব মেয়ের জীবনে অনিশ্চয়তা ছিল, তারা যেন নিজেদের পরিবার নিয়ে সম্মান ও স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে বাঁচতে পারেন।


সাজ্জাদ পারভেজের এই ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তানজিলা। তিনি বলেন, ‘বিয়ের পরও বাবা আমাদের ছেড়ে দেননি। আমরা কোনো বিপদে পড়লে প্রথমেই যার কথা মনে হয়, তিনি হলেন বাবা। আমার সন্তান হওয়ার সময় রাতে রক্তের প্রয়োজন হয়েছিল। খবর পেয়েই তিনি ছুটে আসেন এবং রক্তের ব্যবস্থা করেন। আমার সন্তানকে তিনি নিজের নাতির মতোই দেখেন। আমাদের কাছে তিনি শুধু উকিল বাবা নন, সত্যিকারের বাবা।’


অন্যদিকে, নিজের জীবনের এই ব্যতিক্রমী সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেন না সাজ্জাদ পারভেজও। মেয়েদের কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন তিনি।


তিনি বলেন, ‘আমার নিজের একটি মাত্র ছেলে। মেয়ে না থাকার যে অভাব, সেটা এই মেয়েদের মধ্যে পূরণ হয়েছে। ওদের বিয়ের সময় উকিল বাবা হয়েছিলাম। কিন্তু এখন আর শুধু উকিল বাবা মনে করি না। ওরা আমার সন্তান। ওদের কোনো বিপদ হলে নিজের সন্তানের বিপদ মনে হয়।’


কিছুক্ষণ থেমে চোখ মুছে আবার বলেন, ‘ওদের কারও বিপদের কথা শুনলে এখনও মনে হয়, আমার নিজের মেয়ের বিপদ হয়েছে। তাই যতটুকু পারি পাশে থাকার চেষ্টা করি। মেয়েদের সন্তানদেরও নিজের নাতি-নাতনির মতো দেখি।’


একসময় যাদের পরিচয় ছিল আশ্রয়হীন, ভাসমান কিংবা পথশিশু হিসেবে, সমাজের অনেকেই যাদের আপন করে নিতে চাইত না, তাদের অনেকেই আজ নিজেদের সংসার গুছিয়ে নিয়েছেন। কারও ঘরে সন্তান এসেছে, কেউ স্বামী-সন্তান নিয়ে কাটাচ্ছেন স্বাভাবিক পারিবারিক জীবন। সেই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছে এক মানুষের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা ও মমতা।


সাজ্জাদ পারভেজের গল্পটি তাই কেবল ১৫টি বিয়ের আয়োজনের গল্প নয়; এটি দায়িত্ববোধ, মানবিকতা ও সম্পর্কের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। বিয়ের মঞ্চে ‘উকিল বাবা’ হিসেবে যে সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, সময়ের সঙ্গে তা রূপ নিয়েছে গভীর পারিবারিক বন্ধনে। রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও ভালোবাসা, দায়িত্ব আর বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, বাবা হওয়ার জন্য শুধু জন্মদাতা হলেই হয় না, কখনো কখনো দায়িত্ব ও মমতাই একজন মানুষকে সত্যিকারের বাবা করে তোলে।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?