শিরোনামঃ

চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশনে প্রভাবের অভিযোগ, প্রশ্নের মুখে বিপণন ব্যবস্থা

বাংলাদেশে প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধের সরাসরি গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন কার্যত নিষিদ্ধ। ফলে রোগীরা ওষুধ সম্পর্কে তথ্য জানতে প্রধানত চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট বা ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন উৎসের ওপর নির্ভরশীল। তবে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা ও রোগীর তথ্য জানার অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।


খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান ব্যবস্থায় ওষুধ কোম্পানিগুলো সরাসরি ভোক্তার কাছে তথ্য পৌঁছাতে না পেরে চিকিৎসককেন্দ্রিক বিপণনের ওপর অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এর ফলে বিপণন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ওষুধ শিল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।


আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের (অ্যামচেম) সভাপতি সৈয়দ এরশাদ আহমেদ বলেন, সাধারণ মানুষের ওষুধ সম্পর্কে তথ্য পাওয়ার সুযোগ সীমিত হওয়ায় ভোক্তা সচেতনতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর মতে, যথাযথ নীতিমালার আওতায় ওষুধের কার্যকারিতা ও সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য প্রচারের সুযোগ বাড়ানো প্রয়োজন।


বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা অনুযায়ী, দেশের ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের মোট টার্নওভারের উল্লেখযোগ্য অংশ বিপণন কার্যক্রমে ব্যয় করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যয়ের একটি বড় অংশ চিকিৎসককেন্দ্রিক প্রচারণায় ব্যবহৃত হয়।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ কিছু দেশে নির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় প্রেসক্রিপশন ওষুধের বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ রয়েছে। তবে বাংলাদেশে সরাসরি বিজ্ঞাপনের সীমাবদ্ধতার কারণে বিপণন কার্যক্রম চিকিৎসকদের কেন্দ্র করে পরিচালিত হচ্ছে।


বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্র ও নিউজিল্যান্ড প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধের সরাসরি ভোক্তা-ভিত্তিক বিজ্ঞাপন অনুমোদন করে। এসব দেশে বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি ওষুধের ঝুঁকি, সতর্কতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করতে হয়। অন্যদিকে কানাডার মতো দেশে সীমিত পরিসরে ওষুধ-সংক্রান্ত সচেতনতামূলক প্রচারণা চালানোর সুযোগ রয়েছে।


বাংলাদেশে ওষুধের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণ করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। ১৯৮২ সালের ওষুধ (নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাদেশ এবং পরবর্তী আইন অনুযায়ী প্রেসক্রিপশনভিত্তিক ওষুধের গণমাধ্যমে প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ওষুধ সাধারণ ভোগ্যপণ্য নয়; অনিয়ন্ত্রিত বিজ্ঞাপন মানুষকে স্ব-চিকিৎসায় উৎসাহিত করতে পারে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।


তবে তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে আইন ও নীতিমালা আধুনিকায়নের দাবি তুলেছেন অনেক গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তাঁদের মতে, নিয়ন্ত্রিত কাঠামোর মধ্যে ওষুধের কার্যকারিতা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং জেনেরিক তথ্য জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া হলে রোগীরা আরও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন।


বায়োমেডিক্যাল গবেষক ড. হুমায়রা ফেরদৌস মনে করেন, ওষুধ সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করা জরুরি। তিনি ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ওষুধের জেনেরিক নাম, ব্র্যান্ড, মূল্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য প্রকাশের পরামর্শ দেন।


এদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকারকর্মীদের একটি অংশের মত, নিয়ন্ত্রিত নীতিমালার আওতায় ওষুধের তথ্যভিত্তিক প্রচার অনুমোদন করা হলে রোগীদের সচেতনতা বাড়বে। তবে এর সঙ্গে কার্যকর তদারকি, আইনি কাঠামো এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।


ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আকতার হোসেন বলেন, জনস্বার্থে ওষুধের তথ্য প্রচারে বাধা নেই। তবে কোনো নির্দিষ্ট ওষুধ ব্যবহারে জনগণকে উদ্বুদ্ধ বা প্রলুব্ধ করার মতো প্রচারণা বিদ্যমান আইনের আওতায় অনুমোদিত নয়। তিনি আরও বলেন, ওষুধ কোম্পানিগুলো যেন বিপণনের পরিবর্তে ওষুধের মানোন্নয়ন ও রোগীদের কল্যাণে বেশি বিনিয়োগ করে, সেটিই প্রত্যাশা।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?