শিরোনামঃ

**চায়ের কাপে কুয়াকাটার স্বপ্ন**



_এরিনা রায়:_


ঢাকার গুরুচন্ডালী জীবন নিয়ে চলছে শুভ্র । সকালে ঘুম চোখে টলমল করতে করতে বাসের অপেক্ষার শেষে জ্যাম ঠেলে মিরপুর থেকে মহাখালীর রোজকার যাত্রী শুভ্র । অফিস ৯ টায় তাই বাসা থেকে রওনা করতে হয় ৭ টায় ।দেরী হলেই যাবে গর্দান , শুনতে হবে বসের নানাবিধ খোঁচা।

রোজকার মতই শুভ্র ৭ টায় রওনা করল , কিন্তু বৃষ্টির জন্য বাস আজ লেইট । দাঁড়িয়ে থাকতে হলো ৩০ মিনিট ।তার মানে আজ আর দেরী কেউ আটকাতে পারবেনা । ৩০ মিনিটের দেরীতে  অফিসে ঢুকতে হলো রীতিমতো দৌড়ে । দেখলো এইচ আর সাহেব তার সামনে দাঁড়িয়ে , কিছুটা অপমান সুরে হেসে বলল “কি? শুভ্র সাহেব আজতো বেশ লেইট , মনে আছেতো লেইট মানে কি?” তারপর মুচকি হেসে চলে গেলেন । শুভ্র কিছুটা থমকে নিঃশ্বাস নিয়ে এটেন্ডেন্স খাতায় নাম লিখে চলে গেল তার ডেস্কে ।

এই দেরী যে আজ তাকে কি কি ভোগান্তিতে ফেলবে তা সে ভালোই বুঝতে পারছে । 

আজ বৃষ্টিটা শুভ্রর বেশ ভালো লাগছে হালকা ঠান্ডা হাওয়া সাথে ঝড়ো বৃষ্টি । কাজ করতে করতে প্রায় অনেক রাত হয়ে গেল , অফিস প্রায় ফাঁকা । রাত তখন ৮ টা বেজে ৩০ মিনিট । কিছুটা আড়মোড়া ভেঙে এক কাপ চা বানিয়ে সে অফিসের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে । আর নিচে দেখছে জনকোলাহল রাস্তা । চায়ে চুমুক দিতে দিতে পাশে থাকা ইজি চেয়ারে গা এলিয়ে দেয় শুভ্র । চা খেতে খেতে ভাবছে অজানা কিছু , দূরে পালানোর বৃথা চেষ্টার রাস্তা ।

বসের খিচখিচ , ফাইলের পাহাড় , কাজের চাপ , রোদের উত্তাপ আর রাস্তার জ্যাম থেকে বহু ক্রোশ দূরে ভেসে যেতে চায় শুভ্র । তার ভাবনা আর চায়ের কাপে চুমুক চলছে নিস্তব্ধতায় । সে ভাবছে , ইশ ! যদি এই চায়ের কাপ টা কুয়াকাটা আর চা টা সমুদ্র হতো তাহলে একটা ডুব দিয়ে চলে যেতাম শান্তি খুজঁতে । এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে সে সেই সমুদ্রে ডুব দেয় তা সে বুঝতেই পারেনা । পৌছে যায় সাগরকণ্যার রাজ্যে ।

অনুভব করছে সূর্যোদয়ের পরবর্তী মূহুর্তের হালকা মিষ্টি সকালের রোদ । আবিষ্কার করে সমুদ্রের পাশে সে বসে থাকাকে । সমুদ্রের ঢেউ এসে লাগছে তার পায়ে । হালকা রোদ ,শীতল বাতাস , মাটি ভেজা গন্ধ শুভ্রকে ভুলিয়ে দিচ্ছে তার একঘেয়েমি জীবনকে । বেশ কিছুটা সময় বসে থাকার পর সে হাটতে থাকে বালুর উপর , যেখান থেকে কুড়িয়ে তার পকেটে পুরছিলো অনেক অনেক শামুক-ঝিনুক । সে সাগরের আশেপাশে থাকা প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলোও অনুভব করছিল । ঝাউবন , নারকেল গাছ , ইকো পার্ক , রাখাইনদের বিখ্যাত বৌদ্ধবিহারও দেখল যা শুভ্রকে আনন্দের অনুভূতি দিচ্ছিল । সূর্যাস্ত দেখতে দেখতে  নেমে এলো সন্ধ্যে । পাড়ে বসছে সি-ফুডের দোকান । সেখানে কত ধরনের সামুদ্রিক মাছ , অক্টোপাস , কাঁকড়া আরো কত কি । রাখাইনদের দোকান ও তাদের জীবনযাত্রাও শুভ্রকে নিয়ে যাচ্ছিলো ভালো লাগার অন্য রাজ্যে । এইসব দেখতে দেখতে সে আবার চলে গেলো সমুদ্রের সামনে যেখানে একটি দল লাকড়ি দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে তার আশেপাশে নেচে নেচে গান করছিল । সেই অনুভূতিতে শুভ্রর শরীর কিছুটা নেচে উঠল । সে সমুদ্রের খুব কাছে বসে ঢেউয়ের জলে নিজেকে ভাসাচ্ছিল । 

হঠাত ই তার কানে আসছে কেউ তাকে ডাকছে , “স্যার স্যার রাত ১১ টা বাজে বাসায় যাবেন না ’’? শুভ্রর সম্বিত ফিরে এলো সে বুঝতে পারলো সে এতক্ষণ বেশ  একটা ঘোরে ছিল , সাগরকণ্যার ঘোরে । চোখ মেলে দেখল চায়ের কাপ টা মাটিতে পড়ে আছে আর অফিস বয় তাকে ডাকছে । সে দ্রুত উঠতে উঠতে তাকে উত্তর দিলো “হ্যাঁ যাবো ।’’অফিস বয় চায়ের কাপ টি তুলতে তুলতে বলল , “ অনেকক্ষণ ধরে ডাকছিলাম কিন্তু আপনি সাড়া দিচ্ছিলেন না ।’’ শুভ্র তার সেই কল্পনার জগত থেকে এখনো বের হতে পারেনি । অফিস বয়ের যাওয়ার শব্দে সে বলল , “কিছু বলছিলে আমাকে ’’? অফিস বয় বলল , “ স্যার বাসায় যান অনেক রাত হয়েছে ।’’ শুভ্র তার জিনিসপত্র গুছিয়ে জুতা পরে এটেন্ডেস খাতায় এক্সিট লিখে বেরিয়ে পড়লো বাসার উদ্দেশ্যে । 

আবার ব্যস্ত শহর , রাস্তা , বাসের ভীড় সবের মধ্যেও তার মুখে একটা প্রশান্তির হাসি । হয়তো চায়ের কাপের সেই সমুদ্র তাকে কিছু সময়ের জন্য হলেও একটা অনুভূতি দিয়েছিল এই ব্যস্ত জীবন থেকে কিছুটা প্রকৃতির আবেশ পেতে ।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?