শিরোনামঃ

তোষামোদের রাজনীতি, রাজনীতিতে তোষামোদ


                

আরিফ রহমান।। 


সাম্প্রতিককালে তোষামোদ যেন রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে । নেতাদেরও তোষামোদ খুব পছন্দের । বর্তমানে রাজনীতিতে তোষামোদ ছাড়া কারো যেন কোন দায়িত্ববোধ নেই। কিন্তু দায়িত্ববোধ ছাড়া কি রাজনীতি কখনো সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে চলতে পারে? আসলে তোষামোদ সুগন্ধির মতো, ঘ্রাণ নেওয়া যায় কিন্তু এটা দিয়ে কুলি করা যায় না। তবুও রাজনীতিবিদরা তোষামোদকেই জীবনের অংশ মনে করে। রাজনীতি আর রাজনীতিবিদরা এখন অনেকটা উল্টো পথে চলছে।


রাজনীতিতে মেধার অবমূল্যায়ন করা হচ্ছে। সব কিছু চলছে এখন তোষামোদের মাধ্যমে।তোষামোদ করে অযোগ্যরা রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতথা সর্বমহলে, সকল সেক্টরে সকল ক্ষেত্রে প্রশংসার চেয়ে তোষামোদের চর্চা দিন দিন বেড়েই চলেছে। তোষামোদকে বিভিন্ন নামেও অভিহিত করা হয়, যেমন- তেলবাজী, তৈলমর্দন, স্তাবকতা, চাটুকারিতা, মোসাহেবি, চামচাগিরি ইত্যাদি। এর মাধ্যমেই উপলব্ধি করা যায় যে, তোষামোদ অপবিত্র এবং কলুষিত একটি বিষয়। কারনে অকারনে কারও কোন যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও কোন অনৈতিক সুবিধা লাভ করার জন্য যদি কোন মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা করা হয় সেক্ষেত্রে উক্ত প্রশংসা তোষামোদ বা চাটুকারিতায় রূপান্তরিত।


এক্ষেত্রে তোষামোদ যিনি প্রদান করবেন এবং যিনি গ্রহন করবেন, তারা উভয়েই কলুষিত। তোষামোদ মুখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।ডেল কার্ণেগী তাঁর ` How to win Friends and Influence’ নামক বিখ্যাত বইতে উল্লেখ করেছেন, “The difference between appreciation and flattery? That is simple. One is sincere. One comes from the heart out; the other from the teeth out. One is unselfish; the other selfish. One is universally admired; the other universally condemned.” রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তৃনমূল পর্যায় থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত রীতিমত তোষামোদ কিংবা তেলবাজীর প্রতিযোগিতা চলছে।


আমরা যখন দেখি কোন রাজনৈতিক নেতাকে কোন পদে নিয়োগ লাভ কিংবা রাজনৈতিকভাবে পুরস্কৃত করার কারনে তার অনুসারী এবং সমাজের অন্যান্য অরাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ সম্বর্ধনার মাধ্যমে আকাশে তোলার চেষ্টা করছে তখনই আমরা বুঝতে পারি যে, এটি প্রকৃত ভালবাসা নয়, এটি কিছু পাওয়ার লোভে কৃত্রিম এবং ভেজাল ভালবাসা ব্যতিত আর কিছু নয়।


মনোবিজ্ঞানে বলা হয়েছে, ‘সকল আচরনেরই একটি কারন, উদ্দেশ্য থাকে’। কিছু মানুষ আছে যারা কষ্ট করে তাদের কর্মক্ষমতা বা সততা দিয়ে ভালবাসা অর্জন করতে চায়না। তারা বেছে নেয় ভালবাসা অর্জনের অন্য উপায়। তৈল মর্দনের মতো কুৎসিত পথ।


আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তোষামোদ নিয়ে ‘সাহেব ও মোসাহেব’ নামে একটি কবিতা লিখেছেন যাতে তোষামোদকারী ও তোষামোদ গ্রহীতার বিভিন্ন বৈশিষ্ট ফুটে উঠেছে। এখানে প্রথম দু‘টি প্যারা তুলে ধরছি—


সাহেব কহেন, ‘‘ চমৎকার! সে চমৎকার! মোসাহেব বলে, ‘‘ চমৎকার সে হতেই হবে যে! হুজুরের মতে অমত কার?”


সাহেব কহেন, “ কি চমৎকার, বলতে দাও, আহা হা!” মোসাহেব বলে, “ হুজুরের কথা শুনেই বুঝেছি, বাহাহা বাহাহা বাহাহা”!


শিব খেরা তাঁর ‘You Can Win’ নামক বিখ্যাত বইতে লিখেছেন, “What is difference between appreciation and flattery? The difference is sincerity. One comes from the mouth. One is sincere and the other has an ulterior motive. Some people find it easier to flatter than to give sincere praise. Don’t flatter or get taken in by flatterers”. জনৈক লেখক বলেন,“ Art of flattery needs a good knowledge of the working of the mind of the other person. If one cannot think what the other has in his mind it is difficult one to praise or to flatter him. So, a flatterer must always be a good psychologist. Very few people can resist flattery because when they find their qualities praised they start thinking they are superior to others. This superiority complex satisfies their ego. They feel that no other person can come up to them. As a result of it they do whatever one asks them to do.”


জনাথন সুইফট বলেন, “ স্কুলে একটি পুরাতন নীতি কথা চালু আছে। বোকাদের খাদ্য হচ্ছে স্তাবকতা; কিন্তু মাঝে মাঝে যারা বুদ্ধিমান তারাও ঐ খাদ্যের অংশ বিশেষ খেয়ে থাকেন”। তবে ব্যক্তিভেদে কেউ কেউ তোষামোদকে গ্রহন কিংবা বর্জন করতে পারে। তাই আমাদের রাজনীতিতে তোষামোদের সংস্কৃতি বন্ধ হোক। এর মাধ্যমে ব্যক্তি পুজাসহ সমাজে অনৈতিক কার্যকলাপ হ্রাস পাবে। চলবে .....।  


লেখক ও গবেষকঃ আরিফ রহমান

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?