শিশু মনের শিল্পী: দাদাভাইয়ের ছন্দে আঁকা বাংলাদেশের শৈশব
বাহাউদ্দিন গোলাপ
এই পৃথিবীর সকল রঙ, সকল ছন্দ বুঝি থমকে দাঁড়ায় শৈশবের দরজায়। আর সেই দরজায় দাঁড়িয়ে যে মানুষটি যুগ যুগ ধরে আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন এক সরল, আনন্দময় পৃথিবীর চাবি—তিনি রোকনুজ্জামান খান, যিনি পরিচিত ছিলেন সকলের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত ‘দাদাভাই’ নামে। তাঁর আসল নামটি হয়তো আনুষ্ঠানিকতার ভিড়ে কিছুটা চাপা পড়ে গিয়েছে, কিন্তু এই স্নেহমাখা নামটিই প্রমাণ করে, তিনি কেবল একজন সাংবাদিক বা লেখক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক দার্শনিক অভিভাবক, যিনি শিশুদের সহজ-সরল মনকে ব্যবহার করে ঔপনিবেশিক শাসন-পরবর্তী সময়ে জাতির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণের এক অমূল্য দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর কর্মজীবন ছিল কেবল তথ্য পরিবেশন নয়, বরং শিশু মনের শিল্পী হয়ে বাংলাদেশের শৈশবকে ছন্দে আঁকা এবং মানবতার চারা রোপণের এক নিরলস সাধনা।
১৯২৫ সালের ৯ এপ্রিল সাহিত্য ও মননের উর্বর ভূমি ফরিদপুরের পাংশায় নানার বাড়িতে তাঁর জন্ম। নানা রওশন আলী চৌধুরী ও এয়াকুব আলী চৌধুরীর মতো বিদ্বান ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য তাঁকে ছোটবেলা থেকেই মুক্ত মনের মানুষ হতে শিখিয়েছিল—এ যেন এক সাহিত্যিক বংশপরম্পরার স্বাভাবিক পরিণতি। জীবনের শুরুতেই ১৯৪৭ সালে কলকাতার দৈনিক ইত্তেহাদ এ সাংবাদিকতার মাধ্যমে কর্মজীবনের সূচনা এবং ১৯৫৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাক-এ যোগদানের পর তাঁর কাজের গতি বাড়ে। পরের বছর, ১৯৫৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এদেশের সবচেয়ে বড় শিশু-কিশোর সংগঠন 'কচি-কাঁচার মেলা'। এই সংগঠন এবং ইত্তেফাকের 'কচি-কাঁচার আসর' পরিচালনার জন্যই তিনি সকলের কাছে 'দাদাভাই' নামে পরিচিত হয়ে ওঠেন। যখন পাকিস্তানি শাসকেরা জোর করে আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতি কেড়ে নিতে চাইছিল, সেই কঠিন সময়ে দাদাভাইয়ের এই উদ্যোগ ছিল রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরুদ্ধে একটি সুচিন্তিত সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম তৈরির এক অসাধারণ কৌশল। তিনি তাঁর গবেষণালব্ধ প্রজ্ঞা দিয়ে বুঝেছিলেন, শিশুদের মনে যদি দেশের প্রতি ভালোবাসা, বিজ্ঞান শেখার আগ্রহ এবং অসাম্প্রদায়িকতার শিক্ষা দেওয়া যায়, তবে শাসকেরা কখনোই সফল হবে না। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল তাই দেশের প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসার এক নির্ভরযোগ্য দলিল।
দাদাভাইয়ের সাহিত্যকর্ম ছিল শিশুদের জন্য আনন্দের এক অফুরন্ত ভান্ডার। তাঁর অসাধারণ ছড়া 'হাট্টিমাটিম টিম' বা 'খোকন খোকন ডাক পাড়ি' আজও আমাদের স্মৃতিতে জীবন্ত। এই ছড়াগুলো প্রমাণ করে, তিনি লোকজ ছন্দের শক্তিকে কীভাবে নতুন আঙ্গিকে এনেছিলেন। 'আজব হলেও গুজব নয়' গ্রন্থে তিনি শিশুদের কৌতূহলকে জাগিয়ে তুলেছেন এবং 'ঝিকিমিকি' তাঁর সম্পাদিত একটি গুরুত্বপূর্ণ শিশুসংকলন। 'আমার প্রথম লেখা', 'বার্ষিক কচি ও কাঁচা', এবং 'ছোটদের আবৃত্তি' এর মতো বই সম্পাদনার মাধ্যমে তিনি শুধু নিজে লেখেননি, বরং সাংগঠনিক মেন্টরশিপের মাধ্যমে আরও অনেক নতুন লেখক তৈরি হতে সাহায্য করেছেন। এই সৃষ্টিকর্মগুলোর মধ্য দিয়ে তিনি কোমলমতি শিশুদের মনে সততা, দেশপ্রেম ও ভালো মানুষের গুণাবলি তৈরি করার চেষ্টা করেছেন।
দাদাভাইয়ের নেতৃত্ব কেবল আবেগ নয়, বরং সুচিন্তিত টেকসই সাংগঠনিক মডেলের ওপর নির্ভরশীল ছিলো। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি প্রদীপ জ্বালানোর চেয়ে উত্তম হলো হাজারো হাতে আলোর মশাল তুলে দেওয়া। তবে, এই কাঠামোগত সফলতার পাশাপাশি, শিশুদের কাছে তিনি ছিলেন উষ্ণতা ও অনুপ্রেরণার এক অফুরন্ত উৎস। তাঁর কণ্ঠস্বর ও স্নেহের স্পর্শ বহু প্রতিভার সুপ্ত দুয়ার খুলে দিয়েছে। তাঁর এই বিশ্বাসের ফলেই তিনি 'আমার প্রথম লেখা' সংকলনটি বের করেন এবং কচি-কাঁচার আসর-এ সুফিয়া কামাল, আহসান হাবীব, আব্দুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দিন সহ দেশের সেরা লেখকদের একত্রিত করেছিলেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় 'কচি-কাঁচার মেলা' দ্রুত দেশের প্রতিটি জেলায় ছড়িয়ে পড়ে, যা প্রমাণ করে তাঁর মডেল ছিল কাঠামোগতভাবে মজবুত ও স্বনির্ভর, যা যেকোনো আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। আজকের বাংলাদেশ শিশু একাডেমী গড়ার প্রস্তাবও এসেছিল তাঁর কাছ থেকেই। পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন ‘সওগাত’ সম্পাদক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিনের জামাতা এবং 'বেগম' সম্পাদক নূরজাহান বেগমের স্বামী, যা তাঁকে সংস্কৃতি ও নারী জাগরণের ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী অবস্থান দিয়েছিল। তাঁর এই সংগ্রাম এতটাই দৃঢ় ছিল যে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনারা ক্ষোভে ‘কচি-কাঁচার মেলার’ অফিস ভাংচুর করেছিল। এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ১৯৬৮ সালে বাংলা একাডেমী পুরস্কার, ১৯৯৪ সালে শিশু একাডেমী পুরস্কার এবং মরণোত্তর স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (২০০০) সহ বহু সম্মাননা লাভ করেন।
১৯৯৯ সালের ৩ ডিসেম্বর এই "স্বপ্ন গড়ার মানুষটি" আমাদের ছেড়ে গেলেও, আজকের সময়ে তাঁর আদর্শ আরও বেশি প্রয়োজন। বর্তমানে যখন শিশুরা বৈশ্বিক ডিজিটাল বিভ্রান্তি এবং তথ্যের ভিড়ে মূল্যবোধের সংকটে ভুগছে, তখন দাদাভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত সেই মুক্ত চিন্তা, বিজ্ঞান শেখার আগ্রহ এবং অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের শিক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর হাতে গড়া লক্ষ লক্ষ মানুষ আজ দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন। দাদাভাইয়ের কাজ ছিল কেবল একটি দূরদর্শী ভাবনা নয়, এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদী সামাজিক বিনিয়োগের মডেল, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ফল দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর স্মৃতিচারণ শুধু তাঁকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য নয়, বরং এটি আজকের নীতি নির্ধারক, শিক্ষাবিদ এবং গণমাধ্যম কর্মীদের জন্য একটি আদর্শ পথনির্দেশনা: যেন আমরা তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শকে আজকের নতুন যুগেও ধরে রাখি, নবায়ন করি এবং সাংস্কৃতিক নেতৃত্ব ও জাতি গঠনে তাঁর দেখানো পথে আমাদের শিশুদের একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করি।
বাহাউদ্দিন গোলাপ
(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়,b_golap@yahoo.com, 01712070133)