আসাদের শার্ট: একটি জাতির অলিখিত সংবিধান ও অবিনাশী স্পন্দন

ইতিহাসের কিছু মুহূর্ত থাকে যা কেবল মহাকালের অমোঘ নিয়তি নয়, বরং একটি জাতির সামষ্টিক চেতনার পুনর্জন্ম। মৃত্যু যখন নিছক জৈবিক সমাপ্তি ছাপিয়ে কোনো বিশাল দর্শনের প্রসূতি হয়ে ওঠে, তখনই জন্ম নেয় একজন ‘আসাদ’। ১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছিল তেমনই এক দার্শনিক সন্ধিক্ষণ, যেখানে একটি ঘাতক বুলেট কেবল এক তরুণের বুক চিরে দেয়নি, বরং বিদীর্ণ করেছিল কয়েক দশকের শোষণের শৃঙ্খল। দর্শনের ভাষায় যাকে বলা হয় ‘লড়াইয়ের নান্দনিকতা’, আসাদ তাঁর জীবনের বিনিময়ে সেই নান্দনিকতার চরম শিখর স্পর্শ করেছিলেন। আসাদ ছিলেন মূলত উনসত্তরের রাজনীতির একনিষ্ঠ ঋত্বিক, যার রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল বাঙালির স্বাধীনতার প্রথম আলপনা। 


সেদিন সকাল থেকেই ঢাকার রাজপথ ছিল বারুদের গন্ধে ভারী। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা থেকে গভর্নর হাউসের অভিমুখে যাত্রা শুরু করে, তখন বাতাস ছিল এক মহাবিস্ফোরণের অপেক্ষায়। মিছিলটি যখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে দিয়ে চানখাঁরপুলের দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক তখনই পুলিশের দুভেদ্য ব্যারিকেডের মুখে পড়ে। মিছিলের অগ্রভাগে থেকে আসাদ যখন অকুতোভয় চিত্তে সেই ব্যারিকেড ভাঙার ডাক দিচ্ছিলেন, তখনই ঘটে ইতিহাসের সেই নৃশংসতম ঘটনা। তৎকালীন পুলিশের এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিজে খুব কাছ থেকে আসাদকে লক্ষ্য করে পিস্তল উঁচিয়ে ধরেন। মুহূর্তের মধ্যে গর্জে ওঠে ঘাতকের আগ্নেয়াস্ত্র। একটি বুলেট আসাদের বুক চিরে সরাসরি বেরিয়ে যায়। আসাদ লুটিয়ে পড়লেন রাজপথে; তাঁর শুভ্র সাদা শার্টটি নিমেষেই ভিজে গেল গাঢ় তপ্ত রক্তে। সহযোদ্ধারা যখন তাঁকে পাঁজাকোলা করে ঢাকা মেডিকেল কলেজের জরুরি বিভাগে নিয়ে যান, তখন কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। আসাদের সেই নিথর দেহের ওপর ঝুলে থাকা রক্তে ভেজা সাধারণ শার্টটি মুহূর্তেই রূপান্তরিত হলো একটি পরাধীন জাতির প্রথম অলিখিত মানচিত্রে। এই আত্মত্যাগের গুরুত্ব অনুধাবন করে ১৯৭০ সালেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকে—ঠিক যে স্থানে তিনি শহীদ হয়েছিলেন—সেখানে জনগণ ‘উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের স্মারক ও অমর আসাদ’ শিরোনামে একটি স্মৃতিফলক নির্মাণ করে।


​আসাদের এই আত্মাহুতির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত বঞ্চনা ও নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের এক চরম পরিণতি। ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৬২-র শিক্ষা আন্দোলন এবং ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ৬ দফার মধ্য দিয়ে বাঙালি যে স্বায়ত্ত শাসনের স্বপ্ন বুনছিল, পাকিস্তান রাষ্ট্রযন্ত্র তাকে স্তব্ধ করতে চাইল ১৯৬৮ সালের ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র মাধ্যমে। বাঙালির বাঁচার দাবি ৬ দফাকে দমানোর হীন উদ্দেশ্যে যখন শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান আসামি করে প্রহসনের বিচার শুরু হলো, তখন পূর্ব পাকিস্তানের ছাত্রসমাজ ১১ দফা কর্মসূচির ভিত্তিতে এক অভূতপূর্ব ঐক্যের ডাক দিল। এই তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণের পথেই আসাদের আত্মদান ছিল স্বায়ত্তশাসনের লড়াইকে স্বাধীনতার এক দফার দাবিতে রূপান্তরের চূড়ান্ত অনুঘটক। স্বয়ং ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান তাঁর ডায়েরিতে স্বীকার করেছিলেন যে, ২০ জানুয়ারির সেই হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি তাঁর নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল। আসাদের রক্ত ৬ দফার জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে ছাত্র আন্দোলনের সাথে একীভূত করে এক প্রবহমান মোহনায় মিলিয়ে দিয়েছিল, যার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটেছিল মওলানা ভাসানীর সেই বজ্রনিনাদে— ‘জ্বালো জ্বালো, আগুন জ্বালো’। এই গণজাগরণ এতটাই তীব্র ছিল যে, সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইয়ুব খানের নামফলকগুলো মুছে দিতে শুরু করে। জাতীয় সংসদ ভবনের পাশে অবস্থিত ‘আইয়ুব গেট’ রূপান্তরিত হয় ‘আসাদ গেট’-এ; তেমনি আইয়ুব অ্যাভিনিউ ও আইয়ুব পার্কের নাম বদলে রাখা হয় আসাদ অ্যাভিনিউ ও আসাদ পার্ক। কবি শামসুর রাহমান আসাদের সেই রক্তমাখা শার্টের তেজ দেখে লিখেছিলেন, "আমাদের দুর্বলতা, আমাদের ভীরুতা কলঙ্ক / ধুয়ে দিলো যেন এই শার্টের ওড়াউড়ি।"


​আসাদের এই রাজনৈতিক লড়াইয়ের শেকড় ছিল আরও গভীরে, সরাসরি মাটির কাছাকাছি। আন্তোনিও গ্রামশি যাকে ‘অর্গানিক ইন্টেলিজেন্ট’ বলেছেন, আসাদ ছিলেন ঠিক তেমনই একজন শিকড়মুখী বুদ্ধিজীবী। তৎকালীন ছাত্র ইউনিয়নের লড়াকু এই সৈনিক কেবল রাজপথের গগনবিদারী শ্লোগানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ছিলেন নরসিংদীর শিবপুরের মেহনতি মানুষের এক অকৃত্রিম মুক্তিদাতা। আসাদের ব্যক্তিগত ডায়েরির পাতায় পাতায় ছিল ফ্রান্তজ ফ্যাননের ‘নিপীড়িত মানুষের দর্শন’-এর মতো শোষিত মানুষের মুক্তির আর্তি। সেখানে তিনি নিজ হাতে গড়ে তুলেছিলেন ‘ধনুয়া নৈশ বিদ্যালয়’ ও ‘হাতিয়ার কৃষক সমিতি’, যা ছিল মূলত প্রান্তিক কৃষকদের শোষণমুক্তির এক তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক ভিত্তি। তাঁর এই শিক্ষানুরাগী চেতনাকে স্মরণে রেখেই পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে শিবপুর ও ধানুয়া এলাকার স্থানীয় লোকজনের উদ্যোগে ‘শিবপুর শহীদ আসাদ কলেজ’ এবং ১৯৯১ সালে আসাদের নিজের গ্রাম ধানুয়ায় ‘শহীদ আসাদ কলেজিয়েট গার্লস স্কুল ও কলেজ’ প্রতিষ্ঠিত হয়। আসাদ বিশ্বাস করতেন, মুক্তি কেবল শহরের শিক্ষিত মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুমে বন্দি থাকলে চলবে না, তাকে পৌঁছাতে হবে একদম পর্ণকুটিরের আঙিনায়—যেখানে শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে বাংলার সাধারণ মানুষ। তাঁর সেই গ্রামীণ সাংগঠনিক দর্শনই ২০ জানুয়ারির পর সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্রোহের দাবানল ছড়িয়ে দিয়েছিল, যা বাঙালির স্বাধীনতার পথকে প্রশস্ত করে দেয়।


​আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আসাদের সংগ্রাম ছিল বিশ্বজুড়ে চলা বিপ্লবী কৃষক আন্দোলনের এক দেশীয় রূপান্তর। আজ যখন আমরা ২০২৬ সালের আধুনিক বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে সেই রক্তস্নাত ইতিহাসকে ব্যবচ্ছেদ করি, তখন আমাদের এক গভীর ও নির্মোহ আত্মজিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হয়। আসাদ যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং ইনসাফভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন, আমরা কি তার যোগ্য উত্তরসূরি হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছি? আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে আসাদ কেবল একটি নাম নয়, বরং প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানোর এক শাণিত চেতনা। বর্তমানের ডিজিটাল বৈষম্য ও অর্থনৈতিক অসমতার যুগে আসাদের সেই ‘শিকড়মুখী দর্শন’ হতে পারে আমাদের নতুন মুক্তির পথপ্রদর্শক। আসাদ আজ শারীরিকভাবে অনুপস্থিত, কিন্তু তাঁর সেই রক্তস্নাত শার্ট আজও আমাদের জাতীয় চেতনার আকাশে পতপত করে উড়ছে। সেটি আমাদের প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয় যে, রাষ্ট্রযন্ত্র যখনই শোষকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, তখন প্রতিরোধই হয়ে ওঠে সচেতন নাগরিকের শ্রেষ্ঠ দেশপ্রেম। বলা হয়ে থাকে, ১৯৬৯ সালে আসাদের শাহাদাত বরণই ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করেছিল।


​পরিশেষে, শহীদ আসাদ দিবস ক্যালেন্ডারের পাতায় আটকে থাকা কোনো প্রথাগত শোকগাথা নয়, বরং এটি আত্মবিস্মৃত একটি জাতির জন্য ললাটে পরিহিত এক রক্তিম রাজতিলক। আসাদ মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেননি, বরং মৃত্যুই তাঁর ললাটে এঁকে দিয়েছে অবিনাশী জীবনের মোহর। আসাদের সেই রক্তস্নাত শার্টটি আজও ধুলোবালিতে মলিন হয়নি, কারণ তা কোনো বস্ত্রখণ্ড নয়—বরং মহাকালের প্রতিটি বাঁকে অন্যায় আর শোষণের বিরুদ্ধে এক জীবন্ত ইশতেহার। আসাদের রক্তে যে আলপনা আঁকা হয়েছিল, তা কেবল রাজপথে নয়, বরং একটি পরাধীন জাতির সুপ্ত ধমনীতে সঞ্চার করেছিল সাহসের আদিম স্ফুলিঙ্গ। সেই স্ফুলিঙ্গই কালান্তরে আমাদের অস্তিত্বের অনিবার্য আলোকবর্তিকা। আজকের এই সন্ধিক্ষণে আসাদের স্মৃতি আমাদের হাতছানি দিয়ে ডাকে কেবল কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য নয়, বরং আদর্শিক বর্ম ধারণ করে নতুন লড়াইয়ের শপথ নিতে। মেধা, মানবিকতা আর ইনসাফভিত্তিক স্বদেশ গড়ার সেই দুর্নিবার সাধনাই হোক আসাদের রক্তের শ্রেষ্ঠ ঋণশোধ। আসাদের রক্ত কোনোদিন বৃথা যেতে পারে না; কারণ সেই রক্তেই লেখা আছে বাঙালির আত্মপরিচয়ের শ্রেষ্ঠ উপাখ্যান এবং একটি সার্বভৌম সত্তার অবিনাশী স্বাক্ষর।


​📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ

(লেখক, কলামিস্ট, সংস্কৃতি কর্মী) 

২০ জানুয়ারি, ২০২৬

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?