অভিযোগ, বদলি আর ‘সিন্ডিকেট’ বিতর্কে উত্তাল বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়
বরিশাল জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একের পর এক কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলিকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে তীব্র অস্থিরতা ও চাপা উত্তেজনা। জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকেই ধারাবাহিক বদলির ঘটনাকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। প্রশাসনের ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, তথ্য ফাঁসের সন্দেহ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ শাখাগুলোতে চলছে রদবদল। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সর্বশেষ গত বুধবার সকালে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বরিশালের বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় এবং পৃথক শাখায় বদলি করা হয়েছে। এর আগে নির্বাচনকালীন দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তা, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক শাখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদেরও বদলি কিংবা দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হয়। ধারাবাহিক এসব পরিবর্তনে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা বাড়ছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসনিক সূত্র বলছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অতিরিক্ত অস্থায়ী ভোটকক্ষ নির্মাণ, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ব্যবস্থাপনা, কন্ট্রোল রুম পরিচালনা, ফলাফল সংগ্রহ, পর্যবেক্ষক টিম ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ বিভিন্ন খাতে সরকারি অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে। পরে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বিরুদ্ধে নির্বাচনী ব্যয়ের বিভিন্ন খাতে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা হয়। তবে অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি এবং এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তদন্তের কোনো তথ্যও প্রকাশ্যে আসেনি।
এদিকে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনায় রয়েছে, নির্বাচনকালীন দায়িত্ব পালন করা কিছু কর্মকর্তা সাংবাদিকদের কাছে তথ্য সরবরাহ করেছেন, এমন সন্দেহ থেকেই একের পর এক বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সাধারণ শাখা, এনডিসি শাখা, জুডিশিয়াল মুন্সিখানা ও মানবসম্পদ শাখাসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল করা হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও প্রশাসনের একটি অংশ বিষয়টিকে নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছে, তবে ভেতরে ভেতরে অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী এটিকে ‘চাপ সৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার কৌশল’ হিসেবেই বিবেচনা করছেন।
অন্যদিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী ‘সিন্ডিকেট’ সক্রিয় রয়েছে, এমন অভিযোগও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, কার্যালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে কেন্দ্র করেই এই প্রভাববলয় গড়ে উঠেছে। আলোচনায় থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন সি.এ বাসভবনে কর্মরত মামুন, ডিসি অফিসের নাজির শাখার আসাদ, ট্রেড আই শাখার সাইফুল ইসলাম রুবেল এবং ওমেদার শাকিলসহ আরও কয়েকজন।
সূত্রগুলোর দাবি, বিশেষ করে সাইফুল ইসলাম রুবেল দীর্ঘ প্রায় ১৭ বছর একই দপ্তরে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর পরিবারের একাধিক সদস্যও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্বে রয়েছেন বলে প্রশাসনের ভেতরে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে শাকিলকে নাজির শাখার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবেও উল্লেখ করছেন কেউ কেউ। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বদলি, দাপ্তরিক প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে এই বলয়ের সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের কোনো স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
সর্বশেষ বদলির তালিকায় অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক, হিসাব সহকারী ও সার্টিফিকেট সহকারী পদে থাকা কয়েকজন কর্মচারীকে উপজেলা পর্যায়ে কিংবা ভিন্ন শাখায় পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। বদলি হওয়া কয়েকজন কর্মচারী অনানুষ্ঠানিকভাবে ক্ষোভ প্রকাশ করলেও প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
বিশেষ করে ঈদের মাত্র কয়েক কর্মদিবস আগে ধারাবাহিক বদলির ঘটনায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তৈরি হয়েছে ‘বদলি আতঙ্ক’। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনেকেই এখন নিজেদের অবস্থান নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন বলে প্রশাসনের ভেতরের সূত্রগুলো জানিয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, এসব বদলি কি কেবল নিয়মিত প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, নাকি দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশের পর অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ আরও শক্ত করার পদক্ষেপ, তার স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার মো. খলিল আহমেদ বিভিন্ন মাধ্যমে জানিয়েছেন, বদলির বিষয়টি সম্পর্কে তিনি অবহিত নন। অন্যদিকে জেলা প্রশাসক মো. খায়রুল আলম সুমনের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। বর্তমানে তিনি বরিশালের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।