এক বছরে ধর্ষণ ২৭% , নির্যাতন ২৫% বেড়েছে
একটি কন্যাশিশুর মুখে হাসিতেই ফুটে উঠে একটি পরিবারের স্বপ্ন। মা বাবার পরম যত্নে বড় করা সেই শিশুটি কিংবা কিশোরী যখন ধর্ষণ, নির্যাতন কিংবা হত্যার শিকার হয়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়—ক্ষতবিক্ষত হয় পুরো সমাজ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের যেসব ভয়াবহ ঘটনা সামনে আসছে, তা মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ঘরের ভেতর, রাস্তায়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কিংবা ডিজিটাল মাধ্যমে—কোথাও যেন নিরাপদ নয় নারী ও শিশুরা। যে সমাজে একটি কন্যাশিশুর স্কুলে যাওয়া পর্যন্ত নিরাপদ নয়, যে সমাজে একটি শিশু পাশের বাসার ‘চাচা’, শিক্ষক, প্রতিবেশী কিংবা আপনজনের কাছেও নিরাপদ নয়—সেই সমাজ আসলে কতটা সভ্য?
আজ বাংলাদেশের বাস্তবতা ভয়ঙ্কর এক প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধ নয়; এটি রূপ নিয়েছে সামাজিক মহামারিতে। প্রতিদিন সংবাদপত্রের পাতা খুললেই কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চোখে পড়ে ধর্ষণ, হত্যা, যৌন নির্যাতন, গৃহ নির্যাতন, সাইবার হয়রানি কিংবা ধর্ষিত শিশুর লাশ উদ্ধারের খবর। কোনো দিন রাজধানীর বহুতল ভবনের বাথরুমের বালতি থেকে উদ্ধার হয় শিশুর বিচ্ছিন্ন মাথা, কোনো দিন পাহাড়ি রাস্তায় রক্তাক্ত অবস্থায় হাঁটতে দেখা যায় আরেক শিশুকে। সমাজ যেন ধীরে ধীরে নিষ্ঠুরতার এক গভীর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্ট এবং ব্রাকের সাম্প্রতিক যৌথ গবেষণা এবং বিচার বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সারা বাংলাদেশে বর্তমানে ১ লাখ ৫০ হাজার ৯৫০টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের মামলা আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। যার মধ্যে ৫ বছরের পুরোনো মামলা ৪২,২৭২টি যেটা এখনো নিষ্পত্তির মুখ দেখেনি। আইন অনুযায়ী ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে যা সময় নেয় প্রায় ১৩৭০ দিনের মতো। দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী এসব মামলায় মাত্র ৩ শতাংশের সাজা হয় এবং বাকি ৭০ শতাংশ খালাস পেয়ে যায়।
দেশে প্রতিনিয়তই বাড়ছে ধর্ষন ও নির্যাতনের পরিসংখ্যান, বাড়ছে না নিরাপত্তা এবং ন্যায়বিচার
চলতি বছরে মে মাস পর্যন্ত নারী ও শিশু সহিংসতায় হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনা গুলো দেখলেই বুঝা যায় দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং নৃশংসভাবে হত্যা কতটা বেড়েছেঃ
1) রামিসা হত্যাঃ গত ১৯ মে ২০২৬, মঙ্গলবার রাজধানীর পল্লবীতে শিশু রামিসা হত্যার ঘটনা পুরো দেশের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছে। পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাসান বাসিরের ভাষ্যমতে, শিশু রামিসা স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিল। তাদের পাশের ফ্ল্যাটেই থাকত ঘাতক মাদকাসক্ত সোহেল। দুই ফ্ল্যাটের মাঝখানে ফাঁকা জায়গা থেকে সোহেল শিশুটিকে টেনে রুমের মধ্যে ঢুকিয়ে নেয়। পরে বাথরুমে নিয়ে গলা কেটে হত্যা করে। আমাদের ধারণা ধর্ষণ করে মিশুটিকে গলা কেটে হত্যা করেছে। রামিসার পরিবারের কেউ কল্পনাও করেনি, কিছু সময় পর পাশের ফ্ল্যাটের দরজা ভেঙে উদ্ধার করতে হবে তার মস্তকবিহীন দেহ। বাথরুমের একটি বালতিতে পড়ে থাকবে তার কাটা মাথা। এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়, এটি পুরো রাষ্ট্রের বিবেকের ওপর রক্তাক্ত এক প্রশ্নচিহ্ন।
রামিসার বাবা আক্ষেপ এবং চাপা ক্ষোভ বুকে নিয়ে সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, আমি কার কাছে বিচার দিবো? আপনারা কখনোই পারবেন না আমার মেয়ের হত্যার বিচার করতে।
রামিসার বাবার এমন মন্তব্যই জানান দেয় দেশের বিচার ব্যবস্থার উপর সাধারন জনগন আজ কতটা বিশ্বাস হারিয়েছে।
2) শিশু ইরা হত্যাঃ ২০২৬ সালের ১ মার্চ, রোববার সকাল সাড়ে ৯টা। অন্য দিনের মতোই ঘরের আশপাশে খেলছিল ছোট্ট শিশু ইরা। নিষ্পাপ সেই শিশুটি বুঝতেই পারেনি, পরিচিত এক প্রতিবেশীর ডাকে সাড়া দেওয়া তার জীবনের শেষ পথচলা হতে যাচ্ছে। চকলেটের লোভ দেখিয়ে প্রতিবেশী বাবু শেখ তাকে ফুসলিয়ে নিয়ে যায় সীতাকুণ্ড ইকোপার্কের পাহাড়ি জঙ্গলে। সেখানে চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। একপর্যায়ে বর্বরোচিতভাবে কেটে দেওয়া হয় তার গলা।
রক্তাক্ত অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা শিশুটিকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু মৃত্যুর বিরুদ্ধে সেই লড়াই বেশিক্ষণ টিকলো না। টানা দুইদিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ৩ মার্চ ২০২৬, মঙ্গলবার ভোর আনুমানিক ৫টার দিকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) বিছানায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ইরা। এর আগে গলা কাটা অবস্থায় পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকা ইরার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে শোক, ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, মৃত্যুযন্ত্রণায় কাতর ছোট্ট শিশুটি রক্তাক্ত শরীর নিয়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা করছে। দৃশ্যটি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়, নাড়িয়ে দিয়েছে গোটা জাতির বিবেক।
একটি শিশু মৃত্যুর আগে কতটা যন্ত্রণা সহ্য করলে রক্তে ভেজা শরীর নিয়ে শেষবারের মতো হাঁটার চেষ্টা করে—এই প্রশ্ন এখন প্রতিটি মানবিক মানুষের ভেতরে গভীর ক্ষতের মতো রয়ে গেছে।
3) সাড়ে তিন বছরের শিশুকে ধর্ষণ (এপ্রিল ২০২৬) - এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময়ে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের গোপালদী পৌরসভার জালাকান্দি গ্রামে দাদির সাথে বেড়াতে গিয়ে এক শিশু ধর্ষণের শিকার হয়। নয়ন (১৪) নামের এক কিশোর আম খাওয়ানোর কথা বলে শিশুটিকে আম গাছের নিচে নিয়ে এই অপরাধ ঘটায়। ঘটনার পর শিশুটি অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় এবং ২০শে এপ্রিল ভুক্তভোগীর মায়ের দায়ের করা মামলায় পুলিশ অভিযুক্ত কিশোরকে তার বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে।
4) ফাহিমা হত্যা — ২০২৬ সালের মে মাসের শুরুতে সিলেট সদর উপজেলার জালালাবাদ থানার কান্দিগাঁও ইউনিয়নের সোনাতলা গ্রামে প্রতিবেশীর পাঠানো সিগারেট নিয়ে ঘরে গেলে শিশু ফাহিমাকে ধর্ষণ করা হয়। ধর্ষণের পর ফাহিমাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে ঘাতক জাকির হোসেন। এরপর সে তার স্ত্রীর ওড়না দিয়ে শিশুটির মরদেহ পেঁচিয়ে নিজের ঘরের একটি ব্রিফকেসের (লাগেজ) ভেতর ভরে রাখে। লাশটি ব্রিফকেসে ভরে সে তার নিজের ঘরের খাটের নিচে বা দোতলায় লুকিয়ে রাখে। এই অবস্থায় মরদেহটি ঘরের ভেতর টানা দুই দিন পড়ে থাকে। দুই দিন পর মরদেহটি পচে ঘর থেকে তীব্র দুর্গন্ধ বের হতে শুরু করে। অবস্থা বেগতিক দেখে এবং পুলিশ ও এলাকাবাসীর তল্লাশির মুখে ধরা পড়ার ভয়ে জাকির ব্রিফকেস থেকে লাশটি বের করে রাতের আঁধারে পাশের একটি নোংরা ডোবায় ফেলে দেয়। ঘটনাটি শিশু নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলে।
5) নরসিংদীতে কিশোরী ধর্ষণ ও হত্যা--- নরসিংদীতে আমিনা নামের এক কিশোরীকে ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে বাবার সামনে থেকেই তুলে নেয় স্থানীয় একদল যুবক। অনেক খোঁজাখুজি করে পরদিন ২৬ তারিখ সকালে গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে উদ্ধার করা হয় ধর্ষিত অবস্থায় ওই কিশোরীর মরদহ। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। পুলিশ এ মামলায় ৭ জনকে গ্রেফতার করেছিলো।
6) পাবনায় দাদি ও নাতনি হত্যা---পাবনায় নিজ বাড়িতে দাদি ও তার নাতনিকে হত্যা করা হয়। নিহতরা হলেন সুফিয়া খাতুন (৬৫) এবং তাঁর নাতনি জামিলা আক্তার (১৫)। মেয়েটির বাবা কাজের সূত্রে ঢাকায় থাকায় বাড়িতে শুধু দাদি ও নাতনি থাকতেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় যুবক শরিফুল ইসলাম এর আগে জামিলাকে কুপ্রস্তাব ও শ্লীলতাহানির চেষ্টা করলে জামিলা তাকে চড় মারে এবং দাদি সুফিয়া খাতুন এর প্রতিবাদ করেন। এরপর গত ২৭শে ফেব্রুয়ারি (শুক্রবার) রাত ১১টার দিকে শরিফুল আবার ওই বাড়িতে প্রবেশ করে। দাদি সুফিয়া খাতুন চিৎকার শুরু করলে শরিফুল কাঠের বাটাম বা লাঠি দিয়ে তাঁর মাথায় আঘাত করে, এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। এরপর নাতনি জামিলা চিৎকার করলে তাকে হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করা হয়। পরবর্তীতে তাকে টেনেহিঁচড়ে পাশের একটি শর্ষেখেতে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়।
7) আড়াইহাজারে গৃহবধূ ধর্ষণ- গত মে মাসে ঈদের কেনাকাটা করতে গিয়ে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে চার সন্তানের জননী ধর্ষণ ও ছিনতাইয়ের শিকার হন। ঘটনাটি জনপরিসরে নারীদের নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি সামনে আনে।
8) ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা আসমা সাদিয়া রুনা হত্যা--মে ২০২৬ কুষ্টিয়ার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সভাপতি সহকারী অধ্যাপক আসমা সাদিয়া রুনাকে ছুরিকাঘাতে হত্যার অভিযোগ ওঠে এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে। ঘটনাটি নারী পেশাজীবীদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
9) শিশু তাহিয়া তাসনিম হত্যাঃ রাজধানীর রামপুরায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ৬ বছরের শিশু তাহিয়া তাসনিম তাহাতিকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিশুটিকে ওই নির্মাণাধীন ভবনে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ এবং পাশবিক নির্যাতন করার পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে । এই ঘটনার পর পুলিশ শুরুতেই মামলা গ্রহণে গড়িমসি করায় এবং সিসিটিভি ফুটেজ গায়েব করার চেষ্টার অভিযোগ তুলে ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ও স্বজনরা হাতিরঝিল থানা ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেনস। পরে সন্দেহভাজন ভবনের দারোয়ানকে আটক করেছে পুলিশ।
10)গৃহবধূ ফিমা হত্যা (ঢাকা): ২০২৩ সালে ২০ মার্চ আজিমপুরে জালিয়াতির বিয়ে ও দাম্পত্য কলহের জেরে ১৯ বছর বয়সী কলেজছাত্রী তাহিয়া তাসনিম ফিমাকে পিটিয়ে ও শ্বাসরোধ করে হত্যার অভিযোগে স্বামী কাজী সাগরের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় মামলা চলছে।
11) শিশু আছিয়া হত্যা (মাগুরা): গত বছর ৫ মার্চ মাগুরায় ৮ বছরের শিশু আছিয়া খাতুনকে ধর্ষণের পর হত্যার দায়ে মাত্র ১১ কার্যদিবসে প্রধান আসামি হিটু শেখকে মৃত্যুদণ্ড দেন নিম্ন আদালত, অপরাধে সরাসরি সম্পৃক্ততা প্রমাণিত না হওয়ায় মামলার বাকি ৩ আসামিকে খালাস দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের ২১ মে ডেথ রেফারেন্সের (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের নথি) সমস্ত নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। তবে রায় ঘোষণার এক বছর পেরিয়ে গেলেও উচ্চ আদালতে আপিল শুনানি সম্পন্ন না হওয়ায় মৃত্যুদণ্ডের রায় এখনো কার্যকর করা সম্ভব হয়নি ।
এছাড়াও পুলিশ ও বিভিন্ন গনমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে দেশের বিভিন্ন স্থানে স্বামীর হাতে স্ত্রী হত্যা, যৌতুকের জন্য নির্যাতন এবং পারিবারিক সহিংসতায় বহু নারী প্রাণ হারিয়েছেন। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ১ হাজার ৫৬৫ নারী, যার মধ্যে ১ হাজার ৩৪ জন স্বামীর হাতে নিহত।
শুধু শারীরিক নয়, গত এক বছরে প্রযুক্তিনির্ভর জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতাও আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্ল্যাকমেইল, ব্যক্তিগত ছবি ছড়িয়ে দেওয়া, অনলাইন হুমকি ও হয়রানির শিকার হয়েছেন বহু নারী ও কিশোরী।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—এই ঘটনাগুলো আর মানুষকে আগের মতো বিস্মিত করে না। যেন আমরা ধীরে ধীরে সহিংসতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে শিখে গেছি। প্রতিদিনের লাশ, প্রতিদিনের ধর্ষণ, প্রতিদিনের আর্তনাদ যেন আমাদের অনুভূতিকে অসাড় করে দিচ্ছে। এ এক ভয়াবহ সামাজিক অবক্ষয়।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এক বছরে দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলার সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। একই সময়ে ধর্ষণের ঘটনা বেড়েছে ৫২ দশমিক ৩ শতাংশের বেশি। ধর্ষণের শিকারদের বড় একটি অংশই শিশু ও কিশোরী।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউএনএফপিএ’র যৌথ জরিপ আরও ভয়াবহ বাস্তবতা সামনে এনেছে। দেশের আট বিভাগের মধ্যে নারী নির্যাতনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে বরিশাল বিভাগ।
জরিপ অনুযায়ী—
বরিশালে জীবনে অন্তত একবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮২ শতাংশ নারী
গত এক বছরে নতুন করে সহিংসতা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৫৭ শতাংশ নারী
যৌন নির্যাতনের হার ৩৫.৭ শতাংশ
স্বামীর হাতে স্ত্রী নির্যাতনের ঘটনাও সবচেয়ে বেশি এই বিভাগে
এই পরিসংখ্যান শুধু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একজন নারীর কান্না, একটি শিশুর আতঙ্ক, একটি পরিবারের ভাঙনের গল্প।
বরিশাল মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক মেহেরুন নাহার মুন্নি,বরিশাল বিভাগের নারী নির্যাতনের বর্তমানের উচ্চ হার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমাজে নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নারীর প্রতি সহিংসতার বড় কারণ বলে তিনি মনে করেন।
তিনি জানান, বর্তমানে সামাজিক অসচেতনতা, প্রযুক্তির অপব্যবহার, মাদক এবং কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার নারী ও শিশু সহিংসতাকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। “অনেক সময় ভুক্তভোগী পরিবার মামলা করতে ভয় পায়। আবার অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক ও প্রভাবশালী মহলের চাপ থাকে। অপরাধীরা বুঝে গেছে, বড় অপরাধ করেও অনেক সময় পার পাওয়া যায়। ফলে ভয় কমে গেছে।”
শুধু পুলিশ কিংবা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। পরিবারকে সচেতন হতে হবে। সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী দেখছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে অভিভাবকদের নজরদারি বাড়াতে হবে, বলেন তিনি। শুধু আইন প্রয়োগ করলেই হবে না, সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তনও জরুরি।
তিনি আরও বলেন, “ছেলে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নারীর প্রতি সম্মান শেখাতে হবে। নারীকে মানুষ হিসেবে দেখার শিক্ষা পরিবার থেকেই শুরু হওয়া প্রয়োজন।” সবচেয়ে ভয়ঙ্কর সত্য হচ্ছে—একজন নারী আজ ঘরেও নিরাপদ নন। কখনও যৌতুকের জন্য, কখনও পারিবারিক কলহে, কখনও বিকৃত মানসিকতার কারণে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা। আর শিশুদের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা। যে শিশুটি খেলতে বের হয়, সে আদৌ নিরাপদে ফিরবে কি না—এ নিয়ে এখন আতঙ্কে থাকেন অভিভাবকরা।
তিনি বরিশাল মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের মাধ্যমে ইতিপূর্বে বরিশাল জেলা এবং এর অধীনস্থ ১০টি উপজেলায় মোট ১৫টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ বা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা সহ ,ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার বা ওসিসি-র মাধ্যমে মোট ৩৯৩টি অভিযোগ গ্রহণ এবং সেবা প্রদান ও অধিদপ্তরের নিজস্ব মহিলা সহায়তা কর্মসূচীর আওতাধীন নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেলে মোট ১১৭টি অভিযোগ নিবন্ধিত করেছেন বলে জানান। এছাড়াও তিনি তার অধিদপ্তরের মাধ্যমে বহু পারিবারিক কলহের দ্বারা নির্যাতনের শিকার নারীদের গ্রাম্য আদালত এবং সালিশির মাধ্যমে সুরাহা করে দিতে সক্ষম হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, নারী ও শিশু অধিকার সুরক্ষায় বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অত্যন্ত মানবিক ও দৃঢ় অবস্থানে রয়েছেন। নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং রায় কার্যকরে সরকার প্রধানের আন্তরিক ও নিরলস প্রচেষ্টায় দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আজকের সমাজে শুধু অপরাধ বাড়ছে না, বাড়ছে নিষ্ঠুরতাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, পর্নোগ্রাফি, মাদক, সহিংস কনটেন্ট—সবকিছু মিলে শিশু-কিশোরদের মানসিক জগতে ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে। একসময় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ভাবা হতো। কিন্তু এখন সেই জায়গাগুলোতেও ঘটছে প্রতিনিয়তই যৌন হয়রানি ও নির্যাতন। প্রত্যেকটি পরিবারের উচিত সন্তান কার সঙ্গে মিশছে, কী দেখছে, কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে আরও সচেতন হওয়া। শিশুদের ‘গুড টাচ’ ও ‘ব্যাড টাচ’ সম্পর্কে শিক্ষা এখন সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ পরিবার থেকেই দেয়া দরকার। একই সঙ্গে সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যেন তারা ভয় না পেয়ে সব কথা বলতে পারে।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, নারী নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনার বিচার হয় না। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯৭ শতাংশ ঘটনায় অপরাধীরা শাস্তির বাইরে থেকে যায়।
এই বিচারহীনতাই অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।
একসময় দেশে এসিড সন্ত্রাস ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। পরে কঠোর আইন ও দ্রুত বিচারের কারণে সেই অপরাধ কমে আসে। কিন্তু ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের ক্ষেত্রে এখনো কার্যকর ও দৃশ্যমান শাস্তির অভাব রয়েছে।
যে সমাজে অপরাধীরা জানে তারা সহজেই পার পেয়ে যেতে পারে, সেই সমাজে সহিংসতা বাড়বেই।
রাষ্ট্র ও সমাজের করণীয়
নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—
নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাবমুক্ত বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে
প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ ও সাইবার হয়রানি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে
পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে
শিশুদের আত্মরক্ষামূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে
মাদক ও কিশোর গ্যাং দমনে আরও কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে
একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সেতু, ভবন কিংবা অর্থনীতির অগ্রগতিতে মাপা যায় না। প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই রাষ্ট্রে নারী ও শিশুরা নিরাপদে বাঁচতে পারে।
আজ বাংলাদেশে সেই নিরাপত্তাবোধ ভয়ঙ্করভাবে ভেঙে পড়ছে। প্রতিদিন বাড়ছে লাশের সারি, বাড়ছে আতঙ্ক, বাড়ছে নীরব কান্না।
প্রশ্ন একটাই—আর কত রামিসা, কত ইরা, কত ফাহিমার মৃত্যু দেখলে আমরা জেগে উঠবো?
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা শুধু একটি অপরাধ নয়; এটি মানবতা ও সভ্যতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধ থামাতে হলে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে, সমাজকে মানবিক হতে হবে, আর আমাদের প্রত্যেককে দায়িত্ব নিতে হবে।