অবহেলিত জনপদে আলো ছড়িয়ে  বিদায় নিলেন আলোচিত এসিল্যান্ড  রাজিব


হাসান মাহমুদ:

সরকারি সেবাকে সততার সঙ্গে সাধারণ মানুষের কাছে দিয়ে দেশব্যাপী আলোচিত টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক মো. রাজিব হোসেন সম্প্রতি ঢাকাস্থ সরকারি কর্মচারী হাসপাতালের উপ-পরিচালক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। তার আগে, তিনি প্রায় ৯ মাসের সংক্ষিপ্ত সময়ে ভূঞাপুরে জনকল্যাণমুখী কাজের মধ্যদিয়ে স্থানীয়দের মন জয় করে নিয়েছেন। 

সম্প্রতি ভূঞাপুরে তার পদোন্নতিজনিত বদলির খবর ছড়িয়ে পড়লে সাধারণ মানুষের মাঝে যেমন ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি এক বিদায়ী আবহের সৃষ্টি হয়েছে পুরো উপজেলা জুড়ে। 

জানা গেছে, নাগরিক সেবা, পরিচ্ছন্নতা, যানজট নিরসন ও আধুনিক পৌর ব্যবস্থাপনায় নানা উদ্যোগ গ্রহণ করে স্থানীয়দের মাঝে ব্যাপক আলোচনায় আসেন ভূঞাপুর উপজেলার সদ্য বিদায়ী সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক মো. রাজিব হোসেন। দায়িত্ব পালনের অল্প সময়ের মধ্যেই পৌর শহরের দৃশ্যমান পরিবর্তনে সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। 

সূত্রমতে, গত বছরের ১৭ আগস্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে ভূঞাপুরে যোগদান করেন মো. রাজিব হোসেন। একই সঙ্গে ভূঞাপুর পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বও পালন করেন। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই তিনি পৌর শহরের বিভিন্ন অলিগলি ঘুরে সমস্যা চিহ্নিত করেন এবং নাগরিক ভোগান্তি কমাতে ধারাবাহিক উদ্যোগ গ্রহন করেন। 

তার দায়িত্বকালে দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য উপজেলা প্রাঙ্গণের দক্ষিণ পাশে একটি পুনর্বাসন শেড (স্বপ্ন শেড) নির্মাণ করে বিনামূল্যে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়। ফলে শহরের ফুটপাত অনেকটাই দখলমুক্ত হয়েছে এবং যানজট কমে যায়। 

এছাড়াও পৌর শহর পরিচ্ছন্ন রাখতে ব্যানার, পোস্টার ও ফেস্টুন অপসারণ, ড্রেন পরিষ্কার, রাস্তা সংস্কার এবং পুকুরের ঘাটলা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পৌরবাসীর জন্য সাপ্লাই পানির কার্যক্রম চালু করা হয়, যার উদ্বোধন সম্প্রতি সম্পন্ন হয়েছে। 

অপরদিকে, দীর্ঘদিন ধরে আবাসিক এলাকার ড্রেনে সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য ফেলার কারণে পরিবেশ দূষণের অভিযোগ ছিল। এ সমস্যা সমাধানে পৌরসভার তত্ত্বাবধানে নির্ধারিত ফির বিনিময়ে আধুনিক পদ্ধতিতে সেপটিক ট্যাংকের বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম চালু করা হয়। 

এ জন্য পৌরসভার নিজস্ব গাড়ি ও ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টও চালু করা হয়েছে। রাজিব হোসেনের নির্দেশে যানজট ও বিশৃঙ্খলা কমাতে পৃথক রুটে সিএনজিচালিত যান, অটো ও ভ্যানস্ট্যান্ড স্থাপন করা হয়। সম্প্রসারণ করা হয় বাসস্ট্যান্ডও। পাশাপাশি অটো, ভ্যান ও রিকশাচালকদের সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে ট্রাফিক আইন মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। 

অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পৌর শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। এছাড়া আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ, গৃহস্থালি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অসহায় মানুষের আর্থিক সহায়তা এবং ভূঞাপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ সংস্কারসহ খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষকতাও করেন তিনি। 


নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে পৌরসভাকে আধুনিক ও পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা জারি করেন । তার উদ্যোগে নেওয়া-গৃহস্থালি বর্জ্য ডাম্পিং স্টেশনে স্থানান্তর, পৌরসভার কার্যক্রম ডিজিটালাইজেশন, রাস্তা-ড্রেন উন্নয়ন, সিসিটিভি মনিটরিং বৃদ্ধি, আলোকসজ্জা সম্প্রসারণ এবং পথচারীদের জন্য সুপেয় পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে আরও কয়েকটি উন্নয়নমূলক কাজ চলমান রয়েছে। 

স্থানীয় ভূমি সেবা প্রত্যাশীরা জানিয়েছেন, একসময়ে দালালদের মাধ্যম হয়ে ভূমি সেবা পেতে হতো। কিন্তু রাজিব হোসেন এ উপজেলায় এসিল্যান্ড হিসেবে যোগদানের পর পাল্টে যায় পুরো চিত্র।তিনি যোগদানের পরপর্ই ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত করেন।শুধুমাত্র নির্ধারিত সরকারি ফি’র মাধ্যমে নামজারি এবং ভূমির অন্যান্য সেবা সততার সঙ্গে প্রদান করে এলাকায় ব্যাপক প্রশংসিত হন।  

গৌরনদীতে ছিলো ব্যাপক সুনাম: বরিশালের গৌরনদীতে এসিল্যান্ড হিসেবে চাকুরীকালীণ সময়ে একদিনে আবেদন, একদিনে নামজারি প্রদান করে দেশব্যাপী প্রশংসিত হন। 

ফাটাকেষ্টের ভূমিকায় এসিল্যান্ড: স্বল্প সময়ে দৃশ্যমান উন্নয়ন এবং নাগরিক সেবা প্রদানে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহন করায় অতি অল্প সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক আস্থা অর্জন করেন।বালু খেকো ও অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহন করায় উপজেলার সাধারণ মানুষ তাকে ফাটাকেষ্ট হিসেবে অবহিত করেন।

এসিল্যান্ডের বিরুদ্ধে অপপ্রচার: সম্প্রতি ভূয়াপুর উপজেলার যমুনা নদীর চর কাটার অভিযোগে উপজেলা প্রশাসন অভিযান চালিয়ে ১২টি খননযন্ত্র ও ৩টি মাটি পরিবহনকারী গাড়ি জব্দ করে। এই ঘটনায় মতিন নামের এক ব্যক্তিকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এক বছরের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।এরপর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এই অভিযানের পর থেকেই একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে একটি পক্ষ অপপ্রচার শুরু করেন। 

সদ্য বিদায়ী ভূঞাপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও পৌর প্রশাসক মো: রাজিব হোসেন বলেন, নয় মাসের দায়িত্ব পালনকালে সততা, স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করার চেষ্টা করেছি। ভূমি অফিসে দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিতকরণ, সরকারি স্বার্থ রক্ষা, ভূমি সংক্রান্ত অনিয়ম প্রতিরোধ এবং একটি পরিচ্ছন্ন, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক পৌরশহর গড়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সীমাবদ্ধতা ছিল, তবুও মানুষের কল্যাণে আন্তরিকভাবে কাজ করার চেষ্টা করেছি। ভবিষ্যতেও সরকারী দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করবো।উল্লেখ্য রোববার (২৩) তার নতুন কর্মস্থলে যোগদানের কথা রয়েছে।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?