জুলাই শহীদদের স্মরণে বরিশালে আলোচনা সভা, সংবর্ধনা ও জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী



সাকিব উল হক,

প্রতিনিধি,রিপোর্ট ৭১


"জুলাই পুনর্জাগরণ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৫” উপলক্ষে বরিশাল জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে জেলা শিল্পকলা একাডেমি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হলো শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহতদের সংবর্ধনা, আলোচনা সভা এবং জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র প্রদর্শনী।


অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ছিলেন বরিশাল বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত সচিব) জনাব মোঃ রায়হান কাওছার।


বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জনাব মোঃ মঞ্জুর মোর্শেদ আলম, উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) বরিশাল রেঞ্জ। জনাব মোঃ শফিকুল ইসলাম,পুলিশ কমিশনার,বরিশাল মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং জনাব মোঃ শরিফ উদ্দীন,পুলিশ সুপার, বরিশাল জেলা।


অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বরিশালের জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জনাব মোঃ দেলোয়ার হোসেন।


আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে জুলাই যোদ্ধা আবুল কালাম আজাদ বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে অনেকেই শুধুই একটি আন্দোলন বা অভ্যুত্থান হিসেবে দেখে থাকেন, কিন্তু আমি বলব—এটি ছিল একটি জনবিপ্লব। এই বিপ্লব রচিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন ও স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদ থেকে। আমরা তখন দেশের স্বাধীনতা ও জনগণের অধিকার রক্ষায় মাঠে নেমেছিলাম।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আজ এই বিপ্লবের যোদ্ধারাই অবহেলিত। অনেকেই আমাদের আত্মত্যাগকে ভুলে গেছে। অথচ আমরা বুক পেতে দিয়েছিলাম গুলির সামনে, লাঠিচার্জ ও টিয়ার গ্যাসের সামনে। আজ সেই ইতিহাস পদদলিত করে কেউ কেউ এই আন্দোলনকে নিজেদের রাজনৈতিক ফায়দা তোলার হাতিয়ার বানিয়েছে।”তিনি আরও বলেন, “সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, আজও আমাদের পুলিশ প্রশাসনের একাংশ আমাদের বাঁকা চোখে দেখে। আমরা যারা গুলিবিদ্ধ হয়েছি, রক্ত দিয়েছি, জেল খেটেছি—আজ তারাই যেন প্রশ্নবিদ্ধ!।  আমরা কোনো পদ-পদবি চাই না, চাই শুধু জুলাই অভ্যুত্থান এর স্বীকৃতি, জুলাই শহীদদের মর্যাদা, আহতদের পুনর্বাসন এবং স্বৈরাচার সরকার ও তার দোসরদের বিচার।”


আলোচনা সভায় নিজের অভিজ্ঞতা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরেকজন জুলাই যোদ্ধা তাহমিদ আহনাফ বলেন, “গত বছরের সেই জুলাইতে আমি আমার চোখের সামনে আমার সহযোদ্ধাদের রাজপথে রক্তে লুটিয়ে পড়তে দেখেছি। কেউ শহীদ হয়েছেন, কেউ আজ হুইলচেয়ারে। আমরা স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম—রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু আজ এক বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা যারা বেঁচে আছি, তারা বেঁচে আছি শুধু হতাশায়।”

তিনি প্রশাসন ও অভ্যন্তরীণ সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলেন,“স্বৈরাচারী সরকারের নির্দেশে পুলিশের ও আওয়ামীলীগের কর্মীদের সশস্ত্র আক্রমণে আমার সহযোদ্ধারা শহীদ ও পঙ্গু হয়েছে। আজও সেই স্বৈরাচারী শাসনের দোসররা অবাধে চলাফেরা করছে।” তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গত এক বছরে আমাদের জন্য  কর্মসংস্থানের কোনো ব্যবস্থা নেয়নি প্রশাসন ও আভ্যন্তরীন সরকার।  বরং এখনো আমাদের নানা হুমকি-ধামকির মুখে থাকতে হয়। এখনো কেন সেই সময়ের অপরাধীদের বিচার হয়নি?


জুলাই অভ্যুত্থানে আরেকজন শহীদ আরিফুর রহমানের স্ত্রী সোনিয়া আক্তার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার দেড় বছরের মেয়েটা বাবাহারা হলো। আমার দেড় বছর বয়সী মেয়েটা বাবার মুখ চিনলো না।সে আর কোনোদিন তার বাবাকে ডাকতে পারবে না। এই ছোট্ট মেয়ের পিতৃহারা জীবনের দায় কে নেবে? কেন এখনো স্বৈরাচার সরকারের বিচার হয়নি?”

উল্লেখ্য, আরিফুর রহমান গত ৫ আগস্ট ঢাকায় শহীদ হন এবং ৩ দিন পরে মরদেহ তার পরিবারের কাছে পৌঁছায়।


অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বরিশালের বিভাগীয় কমিশনার জনাব মোঃ রায়হান কাওছার তাঁর বক্তব্যে বলেন, “জুলাই যোদ্ধাদের সম্মান যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ণ না হয়, তা আমরা নিশ্চিত করব। যারা এখনো হুমকি দিচ্ছে বা চক্রান্ত করছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” 

তিনি আরও বলেন,“বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে যারা চাঁদাবাজি, ভূমি দখলসহ অরাজনৈতিক ও অসাধু কর্মকাণ্ডে জড়িত, তাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা হবে। জুলাই যোদ্ধাদের পাশে প্রশাসন সবসময় ছিল এবং থাকবে।”


অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবায়দুল হক চাঁন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল আলম ফরিদ, বরিশালের এনসিপির সভাপতি, বরিশাল জামায়াতে ইসলামীর আমিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও জুলাই আন্দোলনের শহীদদের পরিবার সহ আহত জুলাই যোদ্ধারা।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?