আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে: মেঘের খামে লেখা বাংলার প্রেমকাব্য
◼️ বাহাউদ্দিন গোলাপ
শ্রাবণ—বাংলার বর্ষাচক্রে এক পরিপূর্ণ প্রহর, এক আলাদা ব্যঞ্জনার নাম।আষাঢ়ের টানাপড়েনের পরে শ্রাবণ এসে দিগন্তজোড়া মাঠে ঢেলে দেয় নিশ্চিন্ত নীলচে ছায়া, আর তার গায়ে গায়ে ঘনিয়ে আসে সাদা মেঘের মৃদু ক্যানভাস। যে মেঘেরা পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায়। তারা আসলে কেবল বৃষ্টি বয়ে আনেনা, তারা বয়ে আনে অতীতের গান, লোককথার ধ্বনি, আর ভবিষ্যতের রেণু। বাতাসে ভেসে আসে সোঁদা গন্ধ, মাটির গায়ে নামে একরাশ স্নিগ্ধতা, আর গৃহস্থের উঠোনে বৃষ্টির প্রথম ধারা যেন ছুঁয়ে দেয় শৈশবের কোনো বিস্মৃত কল্পচিত্র। জানালার ধারে বসে মানুষ তখন শুধু বৃষ্টি দেখে না—সে শোনে, অনুভব করে, এমনকি স্বপ্নও দেখে।
এই বৃষ্টি কেবল মেঘের ফোঁটা নয়; এ তো আকাশ থেকে নামা সৃষ্টিরহস্যের অমৃত। প্রতিটি জলকণা পড়ে যায় কদম ফুলের পাপড়িতে, নদীর উদাস তরঙ্গে, শিশিরভেজা ধানগাছের পাতায় – যেন অদৃশ্য কলমে লেখা হচ্ছে বাংলার অনন্ত প্রেমকাব্য। শিমুল গাছের ডালে শিশিরের মুক্তো দুলে, বটের শাখায় গলে পড়ে শ্যামাপাখির গান ঝরঝর সুরে, আর মাটির গায়ে লিখে যায় জলধারার নর্তনী পদচিহ্ন। প্রকৃতি সাজিয়েছে তার অন্তঃপুর – শিউলি ফুলের সাদা পরিধানে, কৃষ্ণচূড়ার রক্তিম আভরণে, আর হিজল গাছের ছায়ায় জমে থাকা নিস্তব্ধতায়।
গ্রামীণ বাংলার প্রান্তরে শ্রাবণের আসল মাহাত্ম্য ধরা দেয় পরিপূর্ণতায়। কৃষকের চোখে-চোখে সেই অনির্বচনীয় প্রত্যাশা – সে তাকিয়ে থাকে আকাশের পানে, যেন পড়ছে মেঘেদের সংকেতলিপি: "হে জলদ-দূত, আমার ধান্যলক্ষ্মীর কানে পরিয়ে দাও মুক্তোর মালা!" গ্রামের মাঠে, বিলের জলে, পুকুরঘাটে, শ্রাবণ নিজের ছবি এঁকে রাখে প্রতিটি দৃশ্যে। কৃষকের পা কাদায় ডুবে যায়, আকাশে চিল ঘোরে, আর মাটিতে ছড়িয়ে পড়ে ধানের চারার সবুজ স্নেহ। এই মাসে জমি পায় তার প্রকৃত পরিচর্যা—জল আর মানুষের ঘামের সহমিলনে জন্ম নেয় শস্যের প্রতিশ্রুতি। দিগন্তজোড়া মাঠে সবুজের ঢেউ খেলে যায়, আইলজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা খড়ের স্তূপে বৃষ্টিধারার ছন্দ শুনতে পায় গ্রাম্য কবিয়াল। দূর থেকে ভেসে আসে নৌকার মাঝিদের ভাটিয়ালি সুর: "শ্রাবণ মাসের দিনেতে ভাসলো নাও..."– যেন পদ্মা-মেঘনা-যমুনার জলও সুরে সুর মেলায়। পাড়ার শিশুরা ভাসায় কাগজের নৌকা, তাতে রাখে শিউলি ফুল আর বাবলা পাতার হাসি। পুকুরপাড়ে শাপলার রক্তিম অভ্যর্থনা, বিলের জলে মাছের ডিম ফোটার উল্লাস – এ সবই তো শ্রাবণের অলিখিত মহাকাব্য।
শহরে শ্রাবণ আসে অন্য ভূমিকায়—যদিও ভিন্ন, তবে কম মধুর নয়। জলাবদ্ধ রাস্তায় নেমে আসে শিশুরা, হাতে ধরা গামলা কিংবা খোলা বইয়ের পাতা—সবই একরকম নৌকা। স্কুলপড়ুয়া কিশোরীরা জানালায় ভিজিয়ে নেয় চুলের ডগা, আর কলেজপড়ুয়া যুবক এক কাপ ধোঁয়া ওঠা চায়ের পাশে বসে চোখ রাখে জীবনানন্দের কবিতায়। অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দার ফুলের টবগুলো হাসে; ফুটপাথে ছাতা ধরা ফুল বিক্রেতার ডাকে মিশে যায় বৃষ্টির টাপুরটুপুর, অলস বিকেল আরও আলসে করে দেয় সাপ্তাহিক অফিস। কফিশপে আধভেজা চুলে বসে থাকা তরুণী হঠাৎ গেয়ে ওঠে — "আজি ঝর ঝর মুখর বাদল দিনে..." এমনকি মেট্রো রেলের জানালার ধারে বসা বৃদ্ধও যেন শুনে ফেলেন কৈশোরের বৃষ্টিস্নাত দিনের গুঞ্জন। শহরের শ্রাবণ তাই মেঘে লেখা চিঠি—যে চিঠি পেরিয়ে যায় ওভারব্রিজ, রেলক্রসিং, বিলবোর্ড আর ছাতা-বৃষ্টির ভিড়।
বাংলা সাহিত্য শ্রাবণকে শুধু ঋতু হিসেবে দেখেনি—একে দেখেছে জীবনের প্রতিচ্ছবি রূপে। বৈষ্ণব পদাবলীতে শ্রাবণ মানে বিরহ, রবীন্দ্রনাথে শ্রাবণ মানে অপেক্ষা, নজরুলে শ্রাবণ মানে দীপ্ত বেদনা, জীবনানন্দে শ্রাবণ মানে নির্জনতা আর নৈঃশব্দ্য। লোকগানে, পালাগানে, জারিগানে বর্ষা ও শ্রাবণ এমন এক চেতনা, যা শ্রোতার মন ভিজিয়ে দেয় বৃষ্টির চেয়ে অনেক গভীরতর বোধে। এই শ্রাবণ বাংলার কণ্ঠে কণ্ঠে, বাঁশিতে, কড়ি-মালায়, বাউলের দোতরায়।
এই দিনে বাঙালির হৃদয়ে ভেসে ওঠে শিকড়ের স্মৃতিমালা। শৈশবের কাগজের নৌকা ভাসে স্মৃতির খালে; মায়ের বকুনি উপেক্ষা করে বৃষ্টিতে ভেজা দুরন্তপনা; দাদুর কোলে বসে শোনা রূপকথা আরও কতো কি। এমনকি আজকাল ডিজিটাল যুগেও সামাজিক মাধ্যম ভরে ওঠে বর্ষার কবিতা আর ছবিতে – প্রমাণ করে বাংলার আবেগের ধারা কখনো শুকোয় না।
কিন্তু শ্রাবণের গভীরতা শুধু সৌন্দর্যে নয় – এর জীবনদায়িনী শক্তিতে। মাছের ডিম ফুটে ওঠে বিলের জলে, বটের শিকড়ে জাগে নতুন পাতা, ধানক্ষেতে সোনালি শিষের সম্ভাবনা বাড়ে প্রতিটি ফোঁটায়। এই বৃষ্টি বাংলার অর্থনীতির অদৃশ্য রক্তস্রোত।
অথচ জলবায়ুর বিপর্যয়ের এই যুগে, যখন মেঘেরা হারায় তাদের পথ, খাল-বিল ভরাট হয় শহরায়নের নামে, মাটি হারায় পানি শোষণের শক্তি, নদী হয়ে ওঠে রুগ্ন তখন শ্রাবণের আমন্ত্রণ যেন এক জরুরি সতর্কবাণীও বটে—যা বলে দেয়,"রাখো জল, বাঁচাও শিকড়। ফিরিয়ে আনো প্রকৃতিকে তার প্রাপ্য স্বরূপে।"
রাতের শহরে শ্রাবণ ধরে ভিন্ন মায়া। রাস্তার বাতিগুলো ভেজা পথে আঁকে দীর্ঘ ছায়া, বারান্দায় জমে থাকা জলে প্রতিফলিত হয় চাঁদের রূপালি মুখ। কবির কলমে ঝরে পড়ে: "বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর, নদে এলো বান..."। শিল্পীর ক্যানভাসে ফুটে উঠে মেঘলা আকাশের নীল-ধূসর রহস্য। এ যেন প্রকৃতির দেওয়া সৃজনশীলতার বর – মানুষের অন্তর্লোকে জাগিয়ে তোলে কবিতার বীজ, গানের সুর, শিল্পের রেখা।
জীবনের গূঢ় দর্শন লুকিয়ে আছে শ্রাবণের ছন্দে। বৃষ্টিধারার মতোই জীবন – কখনো অবিরাম, কখনো মিটমিটে, কখনো বিদ্যুৎঝলকানো। প্রতিটি পতনই যেন নতুন উত্থানের ইঙ্গিত: "ভাঙনের মধ্যেই নিহিত আছে সৃষ্টির বীজ, শুষ্ক হৃদয়েও লুকিয়ে থাকে প্রেমের অঙ্কুর"। শ্রাবণ শেখায় নমনীয়তার মহিমা – যেমন পাতা নুয়ে পড়ে বৃষ্টির ভার বহন করে, তেমনি মানুষও শেখে সংকটে সহনশীল হতে।
শ্রাবণের এই পবিত্র আহ্বানে সাড়া দিই আমরা সবাই – নগরবাসী থেকে গ্রামের কৃষক, শিশু থেকে বৃদ্ধ। আসুন, হৃদয়ের জানালা খুলে দিই মেঘের দিকে। শ্রবণ করি বৃষ্টির সংগীত, স্পর্শ করি শিশিরের শীতলতা, ঘ্রাণ নিই ভেজা মাটির সুবাস। এই রূপালি ধারায় ধুয়ে যাক মনের সমস্ত জঞ্জাল, উজ্জ্বল হোক প্রাণের দর্পণ।
শ্রাবণ শুধু ঋতু নয় – এ এক আধ্যাত্মিক অবগাহন, যেখানে মিলিত হয় অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের স্রোতধারা।
মেঘে-মাঠে-মানুষের মিলনমেলায়
রচিত হোক অমর প্রেমের ইতিকথা –
বাংলার এই রূপালি বারিধারা যেন
চিরকাল ধ্বনিত হয় সৃষ্টির সোপানে।
◼️ বাহাউদ্দিন গোলাপ
১ শ্রাবণ, ১৪৩২