শিরোনামঃ

শহীদুল্লা কায়সার: এক অবিনাশী সংশপ্তকের মানচিত্র

​  


​📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ 


📌 ফেনীর পলল ভূমি থেকে উঠে আসা এক অকুতোভয় কলমযোদ্ধা শহীদুল্লা কায়সার; যাঁর ললাটে ছিল ইতিহাসের অমোঘ লিখন আর হৃদয়ে ছিল শোষিত মানুষের মুক্তির হাহাকার। তিনি কেবল কালজয়ী সাহিত্যের স্রষ্টাই ছিলেন না, বরং নিজেই ছিলেন একটি জীবন্ত আন্দোলন ও অবিনাশী কণ্ঠস্বর। ১৯২৭ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ফেনীর মজুপুর গ্রামে তাঁর যে প্রাণের স্পন্দন শুরু হয়েছিল, তা ছিল মূলত সমকালীন বাংলার এক প্রবল ও প্রলয়ঙ্করী রূপান্তরেরই প্রতিধ্বনি। আবু নঈম মোহাম্মদ শহীদুল্লা কায়সার নামের এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষ তাই জন্মলগ্ন থেকেই বহন করেছিলেন একটি জাতির চেতনার আলোকবর্তিকা হওয়ার দায়ভার, যা তাঁকে পরবর্তীকালে বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের ধ্রুবতারায় পরিণত করেছিল। ​কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে দৈনিক ‘সংবাদ’-এর সম্পাদকীয় টেবিল, কিংবা কায়েতটুলির গোপন বিপ্লবী ডেরা থেকে মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গন—প্রতিটি যুদ্ধক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন পরাজয়হীন এক 'সংশপ্তক'। তাঁর শিক্ষা ও চেতনার বনিয়াদ তৈরি হয়েছিল ফেনী সরকারি পাইলট হাই স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে কৃতিত্বের সাথে প্রবেশিকা এবং ১৯৪৪ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের মাধ্যমে। এরপর কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অর্থনীতিতে বিএ পড়ার সময় তিনি ছাত্ররাজনীতির উত্তাল রাজপথে পা রাখেন। ১৯৪৭-এর দেশভাগ পরবর্তী দাঙ্গা-বিধ্বস্ত ও বিভক্ত ঢাকা জনপদে শহীদুল্লা কায়সার যখন পা রাখলেন, তখন তাঁর হাতে কেবল একটি কলম ছিল না, ছিল একটি জাতির নতুন মানচিত্র গড়ার বজ্রশপথ। ১৯৪৯ সালে তিনি সাপ্তাহিক ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেন এবং একই বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে এমএ-তে ভর্তি হলেও উত্তাল রাজনৈতিক বাস্তবতা ও অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার চেয়ে জীবন-শিক্ষা বড় হয়ে দাঁড়ায়।

 

​পিতা মাওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহর ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং নিজের মার্ক্সীয় দর্শনের যে দ্বান্দ্বিকতা তাঁর মাঝে ছিল, তাকে তিনি এক অপূর্ব সমন্বয়ে রূপান্তর করেছিলেন। শহীদুল্লা কায়সারের জীবনদর্শন ও কলম ছিল একে অপরের পরিপূরক, যা ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলনের অগ্নিগর্ভ সময়ে এক অনন্য উচ্চতা লাভ করে। এই প্রেক্ষাপটেই ১৯৫১ সালের ২৭-২৮ মার্চ ঢাকায় অসাম্প্রদায়িক ও প্রগতিশীল যুবশক্তির সমন্বয়ে গঠিত হয় ‘পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ’। শহীদুল্লা কায়সার কেবল যুবলীগের প্রভাবশালী সদস্যই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন তৎকালীন নিষিদ্ধঘোষিত আন্ডারগ্রাউন্ড কমিউনিস্ট পার্টির অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। পরবর্তীকালে তিনি পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হয়ে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ঢাকার প্রতিটি পাড়ায় পাড়ায় পথসভা ও উঠান বৈঠকে বক্তৃতার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে বোঝাতেন যে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা না হলে বাঙালিরা সরকারি চাকরি ও অর্থনীতিতে পঙ্গু হয়ে পড়বে। তাঁর সেই অমোঘ স্লোগান ছিল— 'ভাষার মুক্তি মানেই ক্ষুধার মুক্তি'। এই তাত্ত্বিক ও সাংগঠনিক উসকানির ‘অপরাধেই’ ১৯৫২ সালের ৮ মে পাকিস্তানি শাসকচক্র তাঁকে প্রথমবার কারান্তরালে নিক্ষেপ করে। এই উত্তাল সময়কালেই শিশুদের অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন প্রগতিশীল শিশু-কিশোর সংগঠন 'খেলাঘর'।


​১৯৫৮ সালে তিনি দৈনিক ‘সংবাদ’-এ সহকারী সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন, যা তাঁর আমৃত্যু কর্মস্থলে পরিণত হয়। সেখানে তিনি ‘উপনয়ন’ ছদ্মনামে তাঁর বিখ্যাত ‘রাজনীতি ও সমাজনীতি’ কলামের মাধ্যমে পাকিস্তানি শোষণের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই জারি রাখেন। ১৯৬১ সালে পাকিস্তানি জান্তা যখন রবীন্দ্রসংগীত নিষিদ্ধ করার অপচেষ্টা চালায়, তখন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ উদযাপন এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক স্বাধিকার রক্ষার আন্দোলনে তিনি ছিলেন এক অকুতোভয় সাংস্কৃতিক সেনানী। ১৯৫৮ সালের ১৪ অক্টোবর সামরিক আইন জারির মাত্র এক সপ্তাহ পর তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়, যার মূল কারণ ছিল কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে তাঁর বলিষ্ঠ অবস্থান। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬২ পর্যন্ত এই দীর্ঘ কারাজীবনে জেলের নির্জন সেলে বসে চরম প্রতিকূলতার মাঝে লেখা তাঁর ডায়েরি ‘রাজবন্দীর রোজনামচা’ আজও বন্দি জীবনের শ্রেষ্ঠ দালিলিক সাক্ষ্য। কারাগারে অন্তরীণ থেকেও তিনি লিখে গিয়েছেন— "মানুষের মন যদি একবার স্বাধীনতার স্বাদ পায়, তবে শিকল তখন অলঙ্কার মনে হয়।"

এই কারাগারই তাঁর জন্য হয়ে উঠেছিল এক তাত্ত্বিক পাঠশালা, যেখানে বসে তিনি লিখেছিলেন ‘সারেং বৌ’ এবং ‘সংশপ্তক’-এর মতো কালজয়ী সাহিত্য। এখানেই তাঁর প্ররোচনায় ও সাহচর্যে মুনীর চৌধুরী লিখেছিলেন কালজয়ী নাটক ‘কবর’। ১৯৬২ সালে কারাগার থেকে মুক্তির পর তিনি ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসের জন্য মর্যাদাপূর্ণ ‘আদমজী সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।


​শহীদুল্লা কায়সারর এই প্রজ্ঞা ও সাহসের মূল প্রোথিত ছিল তাঁর পারিবারিক ঐতিহ্যে। ভাই জহির রায়হান থেকে শুরু করে পরিবারের প্রতিটি সদস্য—এমনকি তাঁদের বোন নীলুফার বেগম (শাহরিয়ার কবিরের মা)—সবাই ছিলেন প্রগতিশীল আন্দোলনের একেকজন সংস্কৃতিকর্মী, যা বাঙালির আন্দোলনে এক অভূতপূর্ব সেতুবন্ধন তৈরি করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের ঠিক আগমুহূর্তে ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ের পর শহীদুল্লা কায়সার এবং জহির রায়হান জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উপকূলে ছুটে যান। ত্রাণ ও জনমত গঠনে তাঁর সেই মানবিক ভূমিকা পাকিস্তানি জান্তার অবহেলার বিরুদ্ধে বাঙালির ক্ষোভকে চরম শিখরে নিয়ে যায়। এরপর ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যখন ‘সংবাদ’ অফিস জ্বালিয়ে দেয়, তখন তিনি তাঁর আজীবনের কর্মস্থলকে ধ্বংস হতে দেখেও মুষড়ে পড়েননি; বরং অবরুদ্ধ ঢাকার ভেতরে থেকেই তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন এক বিপজ্জনক মানবিক ও রাজনৈতিক মিশনে। নিজের জীবন ও পরিবারের নিরাপত্তা তুচ্ছ করে তিনি হয়ে উঠেছিলেন অবরুদ্ধ স্বদেশের অভিভাবক।


​তাঁর কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল পুরনো ঢাকার ২৯ নম্বর কায়েতটুলি লেনস্থ তাঁর বাসভবনটি। বংশাল ও সিদ্দিক বাজারের নিকটবর্তী এই ঘিঞ্জি গলির বাড়িটি তখন হয়ে উঠেছিল একটি দুর্ভেদ্য দুর্গ এবং মুক্তিযোদ্ধাদের এক গোপন ‘কন্টাক্ট পয়েন্ট’। দালিলিক প্রমাণ অনুযায়ী, তিনি ‘সংবাদ’ অফিসে নিজের অবস্থানকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য অর্থ ও তহবিল সংগ্রহ করতেন। জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে তিনি গোপনে ঔষধ, জরুরি রসদ এবং অতি-গোপন তথ্য সীমান্তের ওপারে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে পাঠানোর নিরবচ্ছিন্ন ব্যবস্থা করতেন। অবরুদ্ধ ঢাকার ভেতরে শত্রুসেনার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে সেই তথ্য মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক শক্তিশালী নেটওয়ার্কের প্রাণভোমরা ছিলেন তিনি। এমনকি অনেক বিপন্ন হিন্দু পরিবারকে জীবন রক্ষায় নিজের প্রভাব ও সম্পদ ব্যবহার করে ছদ্মবেশে সীমান্ত পাড়ি দিতে সরাসরি সাহায্য করেছেন। অবরুদ্ধ সেই দুঃসময়ে যখন অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী আতঙ্কে আত্মগোপনে ছিলেন, তিনি তখন কনিষ্ঠ সহকর্মী ও বিপন্ন রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য ছিলেন অটল এক আশ্রয়ের মহীরুহ। স্ত্রী পান্না কায়সারের সাহচর্য আর ভাই জহির রায়হানের সাথে সেই আদর্শিক মিথস্ক্রিয়া তাঁকে এই অকুতোভয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শক্তি জুগিয়েছিল।


​বিজয়ের ঊষালগ্নে ১৪ ডিসেম্বর যখন আলবদর বাহিনীর ঘৃণ্য চক্রান্তে শহীদুল্লা কায়সারকে তাঁর সেই কায়েতটুলির বাসা থেকে অপহরণ করা হয়, তখন মূলত একটি জাতির শ্রেষ্ঠ মেধাকেই স্তব্ধ করে দেয়ার এক পৈশাচিক চেষ্টা হয়েছিল। পান্না কায়সারের স্মৃতিচারণে উঠে আসে সেই বীভৎস মুহূর্ত, যখন ঘাতকরা তাঁর চোখ বেঁধে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। এর মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি হারানো অগ্রজকে খুঁজতে গিয়ে মিরপুরের বধ্যভূমিতে শহীদ হলেন অমর চলচ্চিত্রকার ও কথাসাহিত্যিক জহির রায়হান—যা বাংলার ইতিহাসের এক মহাকাব্যিক ও রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডি। দুই ভাইয়ের এই আত্মদান বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্রের এক অপূরণীয় ক্ষত। পাবলো নেরুদার মতো তিনিও বিশ্বাস করতেন— "তারা সব ফুল ছিঁড়ে ফেলতে পারে, কিন্তু বসন্তের আগমন থামাতে পারবে না।" তাঁর রক্তভেজা সেই বসন্তই আজ আমাদের স্বাধীন মানচিত্র।


​শহীদুল্লা কায়সার আজ কেবল আমাদের ইতিহাসের অংশ নন, বরং তিনি আমাদের অস্তিত্বের এক অনিবার্য চেতনার নাম। সময়ের আবর্তে তাঁর শারীরিক প্রস্থান ঘটলেও, তিনি বেঁচে আছেন এক অবিনাশী 'সংশপ্তক' হিসেবে, যাঁর দর্শনের কোনো ক্ষয় নেই, যাঁর আদর্শের কোনো বিনাশ নেই। আজ যখন আমরা একটি সমৃদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, তখন তাঁর জীবনবীক্ষা আমাদের প্রধান পাথেয় হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর এই অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর ‘একুশে পদক’ এবং ১৯৯৮ সালে দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘স্বাধীনতা পদক’-এ ভূষিত করে। কদম সারেংয়ের লড়াই কিংবা জাহেদের আদর্শবাদ—সবকিছুর মূলে ছিল মানুষের প্রতি তাঁর অগাধ ভালোবাসা। তিনি আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন, কলম যখন শোষিতের পক্ষে দাঁড়ায়, তখন তা কামানের গোলার চেয়েও শক্তিশালী হয়। কালের গর্ভে অনেক নাম হারিয়ে যায়, কিন্তু শহীদুল্লা কায়সারের কালজয়ী প্রজ্ঞা চিরকাল আমাদের জাতীয় চেতনার ধ্রুবতারা হয়ে জ্বলবে।


শততম জন্মলগ্নে শহীদুল্লা কায়সার আমাদের জন্য কেবল স্মৃতি নন, বরং এক জীবন্ত বিবেক। তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন, কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও শিরদাঁড়া সোজা রেখে সত্যের পথে অবিচল থাকতে হয়। যতক্ষণ এই বাংলায় বৈষম্য আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ রুখে দাঁড়াবে, ততক্ষণ শহীদুল্লা কায়সারের অবিনাশী কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হবে রাজপথে, মিছিলে আর মুক্তবুদ্ধির প্রতিটি প্রাঙ্গণে।




📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ

(লেখক: প্রাবন্ধিক, গবেষক ও সংস্কৃতি কর্মী। ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়। b_golap@yahoo.com)

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?