নৌকায় বসবাসকারী মান্তা জেলেদের পাশে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার আহ্বান
জলেভাসা মান্তা জেলে জনগোষ্ঠীর জন্য সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা। বুধবার ঢাকায় এক শিখন অনুষ্ঠানে তাঁরা বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আর্থিক সেবা ও সরকারি সহায়তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের মান্তা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে তাঁদের টেকসই উন্নয়ন।
দক্ষিণাঞ্চলের নদীতে ঐতিহ্যবাহী কাঠের নৌকায় বসবাস করেন মান্তা পরিবারের অনেকে। নদীভাঙন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পরিবেশদূষণে তাঁদের ঝুঁকি বেড়েছে। হুমকির মুখে পড়েছে জীবিকা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও। স্থায়ী ঠিকানা না থাকায় অনেকের পক্ষে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) পাওয়া, শিশুর জন্মনিবন্ধন করা, সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করা এবং সরকারি সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুবিধা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
‘সেবার শেষ প্রান্তে পৌঁছাতে একসঙ্গে: মান্তাকানেক্ট প্রকল্পের অভিজ্ঞতা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানটি রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হয়। দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের সহায়তায় এর আয়োজন করে ইয়ুথনেট গ্লোবাল।
ইয়ুথনেট গ্লোবাল, জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট ও ডকটাইম যৌথভাবে মান্তাকানেক্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রযুক্তিনির্ভর নানা উদ্যোগের মাধ্যমে মান্তা জেলেদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও আর্থিক সেবা পাওয়ার সুযোগ বাড়ানো এ প্রকল্পের লক্ষ্য। অনুষ্ঠানে ছিল প্যানেল আলোচনা, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী, প্রকল্পের অভিজ্ঞতা নিয়ে তৈরি শিখন দলিল উপস্থাপন, মান্তা জনগোষ্ঠীর পরিবেশনা ও অনানুষ্ঠানিক মতবিনিময়। অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, জরুরি সেবায় মান্তা জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা ও কমিউনিটির অংশগ্রহণ জরুরি।
## সেবা পেতে বৈষম্য, মাছ কমে যাওয়ার উদ্বেগ
সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং বড় ট্রলারের মাছ ধরায় মাছের মজুত কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ জানান মান্তা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। তাঁরা বলেন, সরকার ঘোষিত ২২ দিনের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় কিছু পরিবার সংসার চালাতে হিমশিম খায়। এ সময় জেলেদের জন্য চাল বিতরণ কর্মসূচি থেকেও কেউ কেউ বাদ পড়েন।
বরিশালের লাহারহাটের মান্তা জনগোষ্ঠীর নেতা জসিম সরদার সহায়তা অব্যাহত রাখার আবেগঘন আহ্বান জানান। তিনি বলেন, “আমাদের আলোর পথে এনে কেন অন্ধকারে রেখে যাবেন? আমাদের ছেড়ে যাবেন না, আমরা সারা জীবন আলোর পথে থাকতে চাই।”
জেলে পরিচয়পত্র ও রেশন কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায্যতার দাবি জানান তিনি। কমিউনিটির কবরস্থানের জন্য জমির ব্যবস্থা করায় সহায়তাকারীদের ধন্যবাদও জানান। এ ছাড়া আর্থিক সাক্ষরতা, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষায় আরও সহায়তা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
## ২০০ শিশুর জন্মনিবন্ধনে সহায়তা, প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ২০০ জন
ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, প্রকল্পের আওতায় ২০০ শিশুর জন্মনিবন্ধনে সহায়তা করা হয়েছে। ২০০ জন কমিউনিটি সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং ৩০ জন স্থানীয় তরুণ স্বেচ্ছাসেবককে যুক্ত করা হয়েছে। আর্থিক সাক্ষরতা প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ১৫০ জন, যাঁদের ৬০ শতাংশ নারী।
তিনি এই প্রক্রিয়াকে ‘ডিজিটাল রূপান্তর’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তবে পরিচয়পত্র, শিক্ষা, আর্থিক সেবা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতার সুযোগ পেতে বাধা এখনো রয়ে গেছে বলে জানান তিনি।
জাগো ফাউন্ডেশন ট্রাস্টের ইফতেখারুল করিম বলেন, প্রকল্পের শিক্ষা কার্যক্রমে শিশুদের গড় উপস্থিতি ছিল ৯৮ শতাংশ। কেউ পড়াশোনা ছেড়ে দেয়নি।
ডকটাইমের তানভীর রাশেদ জানান, প্রকল্পের আওতায় ২৫০ জনের বেশি রোগীকে সেবা দেওয়া হয়েছে। ওষুধ সহায়তা, সাশ্রয়ী মূল্যে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা এবং নিয়মিত খোঁজখবর—এই তিনটি ক্ষেত্রে আরও সহায়তা দরকার বলে মনে করেন তিনি।
দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রোগ্রাম অ্যাসোসিয়েট কাশফিয়া জামান দূরশিক্ষণ, টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল সাক্ষরতা, মোবাইল আর্থিক সেবা, স্থানীয় শাসনব্যবস্থা ও কমিউনিটির মানুষকে সংগঠিত করার কাজ তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কমিউনিটির সদস্যদের শেখার আগ্রহ আছে, তবে প্রাথমিক দক্ষতা আরও জোরদার করা দরকার।
## জরিপ, বিকল্প জীবিকা ও বেসরকারি খাতের ভূমিকার দাবি
সোহানুর রহমানের সঞ্চালনায় প্যানেল আলোচনায় অংশ নেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. আহমেদ আবিদ, ডকটাইম লিমিটেডের প্রধান চিকিৎসা কর্মকর্তা ড. তানজিনা শারমিন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারের হালিমা বেগম এবং টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নাদিরা রহমান।
আলোচনায় মান্তা জনগোষ্ঠী সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পেতে জরিপ ও আরও গবেষণার প্রয়োজনের কথা উঠে আসে। নারী ও কিশোরীদের গোপনীয়তা রক্ষা করে নৈতিকভাবে তথ্য ও অভিজ্ঞতা নথিবদ্ধ করার ওপরও জোর দেন বক্তারা। মাসিক স্বাস্থ্য, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নদী রক্ষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও বিকল্প জীবিকা নিয়েও কথা বলেন তাঁরা। মান্তা জেলেদের সহায়তায় বেসরকারি খাতকে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে আহ্বান জানান বক্তারা।
## স্থায়ী স্কুল ও দক্ষতা প্রশিক্ষণে জোর
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আহমাদুল হক বলেন, কমিউনিটির মানুষের কথা শুনতে হবে, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাঁদের যুক্ত করতে হবে এবং তাঁদের প্রয়োজন অনুযায়ী সেবা সাজাতে হবে। মান্তা সংস্কৃতি সংরক্ষণের পাশাপাশি মানুষের দোরগোড়ায় জরুরি সেবা পৌঁছে দেওয়ার ওপরও জোর দেন তিনি।
বরিশাল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফরিদা সুলতানা বলেন, সেবা ও অধিকার সম্পর্কে মান্তা জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বেড়েছে। তিনি বলেন, “মান্তা কমিউনিটি সেবা সম্পর্কে সচেতন ছিল না, অধিকার সম্পর্কেও জানত না। এখন তারা জানে। এটি অনেক বড় অর্জন।” মান্তা শিশুদের জন্য স্থায়ী স্কুল নির্মাণে জমি ও অর্থের ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে সমন্বয়ের অঙ্গীকারও করেন তিনি।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের যুগ্ম সচিব নেওয়াজ হোসেন চৌধুরী পরিবার পরিকল্পনা, আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্যসম্মত পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতার ওপর গুরুত্ব দেন। বক্তব্যের শেষে তিনি বলেন: “নৌকা যাদের ঘর, নৌকা যাদের ভেলা, তাদের জন্য করতে কাজ, করব নাকো হেলা।”
সরকারের সাবেক সচিব ফরিদুল ইসলাম বলেন, মান্তা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সরকারি দক্ষতা প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ আছে। এ ধরনের ১৭২টি কর্মসূচি রয়েছে বলে জানান তিনি। পাশাপাশি নদী ও মাছনির্ভর মান্তা সংস্কৃতি সংরক্ষণের ওপরও জোর দেন তিনি।
দ্য এশিয়া ফাউন্ডেশনের টিম লিডার সারা এল. টেলর বলেন, ‘কাউকে পেছনে না রাখার’ বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার মান্তা জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা জোরদার করার সময়োপযোগী সুযোগ তৈরি করেছে।