জহির রায়হান: সেলুলয়েডের দ্রোহ ও এক অবিনাশী নক্ষত্রের মহাপ্রস্থান


​📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ 


📌 সময় কখনো কখনো এমন কিছু মানুষের জন্ম দেয়, যারা কেবল সমকালকে ধারণ করেন না, বরং মহাকালের ললাটে এঁকে দেন দ্রোহ ও সৃজনের অমোঘ তিলক। জহির রায়হান ছিলেন ঠিক তেমনই এক আলোকবর্তিকা, যাঁর জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনীর মজুপুর গ্রামে, এক অস্থির ও দ্বান্দ্বিক ঔপনিবেশিক বাংলায়। তাঁর জন্মকালীন প্রেক্ষাপট ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতনোন্মুখ ঘণ্টা এবং আসন্ন দেশভাগ ও সাম্প্রদায়িকতার এক কৃষ্ণগহ্বর, যা মানবিকতার আদিম নির্যাসকে গ্রাস করতে চাইছিল। তাঁর পারিবারিক আবহ ছিল জ্ঞানচর্চা ও প্রগতিশীল রাজনীতির এক অনন্য সংমিশ্রণ; পিতা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহর পাণ্ডিত্য এবং বড় ভাই প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের আদর্শিক ছায়া তাঁর ব্যক্তিত্বের ভিত গড়ে দিয়েছিল। জহির রায়হান কেবল একজন ব্যক্তি নন, বরং তিনি ছিলেন একাধারে একটি কালখণ্ড, একটি বিপ্লব এবং একটি বিপন্ন জাতির অবদমিত আর্তনাদ। তাঁর প্রয়াণের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজ যখন আমরা তাঁর জীবন ও দর্শনের ব্যবচ্ছেদ করি, তখন স্পষ্ট হয় যে—তিনি কেবল ফ্রেমবন্দি জীবনের কারিগর ছিলেন না; তিনি ছিলেন ইতিহাসের এক নির্মম সত্যসন্ধানী এবং সময়ের নির্মোহ ভাষ্যকার।


​জহির রায়হানের বেড়ে ওঠা ছিল ভাষা আন্দোলনের রক্তিম সোপান বেয়ে। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি যখন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ছাত্রজনতা রাজপথে, তখন যে ১০ জন সাহসী তরুণ প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে মিছিল বের করেছিলেন, জহির রায়হান ছিলেন তাঁদের অন্যতম। এই রাজনৈতিক সক্রিয়তাই তাঁর শিল্পদর্শনকে দিয়েছে এক গভীর নান্দনিক ও তাত্ত্বিক ভিত্তি। ১৯৫০ সালে ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় যোগদানের মাধ্যমে তাঁর সাংবাদিকতা জীবনের যে সূচনা, তা পরবর্তীতে ‘কাফেলা’, ‘যান্ত্রিক’ এবং বিশেষ করে ফজলুল হক সম্পাদিত জনপ্রিয় ‘সিনেমা’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে তাঁর শোষিত মানুষের কণ্ঠস্বর ও সাংস্কৃতিক দ্রোহে রূপান্তরিত হয়েছিল। সাহিত্যে তাঁর পদচারণা ছিল রাজকীয়; ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসে গ্রামীণ সামন্ততান্ত্রিক অন্ধকার ব্যবচ্ছেদ করে তিনি অর্জন করেন ‘আদমজী সাহিত্য পুরস্কার’। ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে লেখা তাঁর ‘আরেক ফাল্গুন’ উপন্যাসটি আজও এ জাতির এক অবিনাশী স্মৃতিস্তম্ভ।


তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণশৈলী ছিল তাঁর সময়ের চেয়ে কয়েক আলোকবর্ষ অগ্রবর্তী। ১৯৬৪ সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘সঙ্গম’, যা ছিল তৎকালীন সমগ্র পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র; রূপালী পর্দার সেই বর্ণিল আভা কেবল দর্শককে মুগ্ধ করেনি, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের কারিগরি সক্ষমতার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল। এর ঠিক পরের বছরই তিনি ‘বাহানা’ (১৯৬৫) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঢাকাই সিনেমাকে পরিচয় করিয়ে দেন পাকিস্তানের প্রথম সিনেমা-স্কোপ বা চওড়া পর্দার অভিজ্ঞতার সাথে, যা লাহোর ও বোম্বে ভিত্তিক চলচ্চিত্রের একচেটিয়া আধিপত্যকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানিয়েছিল। তবে তাঁর সৃজনশীলতার চরম শিখর ছিল ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০)। এটি কেবল একটি চলচ্চিত্র ছিল না, বরং ছিল বাঙালির স্বায়ত্ত শাসনের এক প্রামাণ্য ইশতেহার; যেখানে একটি পরিবারের অন্দরমহলের স্বৈরাচারী কর্তৃত্বকে তিনি রাজপথের স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের রূপক বা ‘পলিটিক্যাল মেটাফর’ হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন—যা বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে এক অনন্য শিল্পরূপ।


​কারিগরি উৎকর্ষের পাশাপাশি জহির রায়হান বাংলার লোকজ ও ধ্রুপদী আখ্যানকেও দিয়েছিলেন নতুন মাত্রা। তাঁর নির্মিত ‘বেহুলা’ (১৯৬৬) ছিল বাংলার চিরায়ত লোকগাথাকে রূপালী পর্দায় জীবন্ত করার এক অসামান্য প্রচেষ্টা, যা কেবল বাণিজ্যিকভাবেই সফল হয়নি, বরং লৌকিক সংস্কৃতির শক্তিতে গণমানুষকে উজ্জীবিত করেছিল। অন্যদিকে, ‘আনোয়ারা’ (১৯৬৭) চলচ্চিত্রে তিনি গ্রামীণ সমাজের নিষ্ঠুর বাস্তবতা ও নারীর ত্যাগের যে সংবেদনশীল চিত্রায়ন করেছিলেন, তা আজও সমাজতাত্ত্বিক বিচারে অনবদ্য। এছাড়া ‘কাঁচের দেয়াল’ (১৯৬৩) চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি মধ্যবিত্ত সমাজের মনস্তাত্ত্বিক জটিলতা ও অন্তর্দহনকে যে নিপুণতায় ক্যামেরাবন্দি করেছিলেন, তা তাঁকে সেই সময়েই একজন প্রথাবিরোধী ও আধুনিক ধারার দূরদর্শী নির্মাতার স্বীকৃতি দিয়েছিল। প্রতিটি ফ্রেমে তিনি ভাঙতে চেয়েছিলেন গতানুগতিকতার দেয়াল, আর গড়তে চেয়েছিলেন এক নতুন শৈল্পিক ব্যাকরণ।


​১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ জহির রায়হানকে নিয়ে গিয়েছিল এক আন্তর্জাতিক তাত্ত্বিক স্তরে। যখন একটি জাতি নিয়মতান্ত্রিক গণহত্যার শিকার হচ্ছিল, তখন তিনি তাঁর মেধাকে রূপান্তরিত করেছিলেন প্রতিরোধের ধারালো হাতিয়ারে। তাঁর নির্মিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ কেবল একটি প্রামাণ্যচিত্র ছিল না, বরং তা ছিল বিশ্ববিবেকের প্রতি এক তীব্র নৈতিক চপেটাঘাত। লাতিন আমেরিকার ‘থার্ড সিনেমা’ আন্দোলনের সমান্তরালে তিনি ক্যামেরা-পেন ব্যবহারের মাধ্যমে যে দালিলিক বাস্তববাদ (Cinéma Vérité) সৃষ্টি করেছিলেন, তা বিশ্ব চলচ্চিত্র ইতিহাসে লুই বুনুয়েল বা জঁ-লুক গদারের সমান্তরালে তাঁকে আসীন করে। ১৯৭২ সালে তাসখন্দ আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে এবং পরবর্তীতে দিল্লির উৎসবে মর্যাদাপূর্ণ ‘সিডলক পুরস্কার’ অর্জন তাঁর সেই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডকেই সত্যায়িত করে।


বিজয়ের রক্তিম সূর্য উদিত হওয়ার পর জহির রায়হান ফিরেছিলেন এক ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা বিধ্বস্ত দেশে; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সংগ্রাম এক মুহূর্তের জন্যও থেমে থাকেনি। স্বজন হারানোর তীব্র আর্তি আর বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নিখোঁজ হওয়ার ক্ষত তাঁকে এক মুহূর্ত স্থির থাকতে দেয়নি। তবে এই সময় তাঁর ভূমিকা কেবল একজন শোকাতুর ভাইয়ের ছিল না; তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক নির্ভীক তথ্যানুসন্ধানী। ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি ‘বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড তদন্ত কমিটি’র আহ্বায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে পর্দার অন্তরালের সেই কুৎসিত ষড়যন্ত্র উন্মোচনে মরণপণ ব্রত নেন। তিনি বুঝেছিলেন, এই গণহত্যা কেবল পাকিস্তানি বাহিনীর কাজ ছিল না, এর পেছনে ছিল এ দেশীয় এক বিশাল চক্রান্তকারী চক্র।


​২৮ জানুয়ারি ১৯৭২ সালে ঢাকার প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক রুদ্ধশ্বাস ও জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে জহির রায়হান তাঁর জীবনের সবচেয়ে সাহসী ও সম্ভবত সবচেয়ে বিপজ্জনক ঘোষণাটি দিয়েছিলেন। তিনি অত্যন্ত জোরালোভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করেন যে, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের যাবতীয় দালিলিক প্রমাণ তাঁর হস্তগত হয়েছে। ঘাতকরা পালানোর সময় যে ডায়েরি, গোপন নথিপত্র এবং হত্যার সুনির্দিষ্ট নীলনকশার তালিকা ফেলে গিয়েছিল, তার একটি বড় অংশ তিনি সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন যে, এই নথিতে কেবল খুনিদের নামই নেই, বরং আছে তাদের প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের পরিচয়। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করেছিলেন, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তিনি এই বিস্ফোরক ও অকাট্য প্রতিবেদন স্বয়ং বঙ্গবন্ধুর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করবেন।


​ইতিহাস বিশ্লেষকদের মতে, জহির রায়হানের হাতে থাকা সেই ‘ঘাতক ডায়েরি’ এবং দালিলিক প্রমাণগুলো ছিল তৎকালীন ক্ষমতার অলিন্দে ঘাপটি মেরে থাকা অনেক ছদ্মবেশী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের জন্য এক চরম অস্তিত্বের হুমকি। জহির রায়হান জানতেন, সত্য উন্মোচনের এই পথ তাঁর জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে; তবুও তিনি আপস করেননি। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারির সেই কুয়াশাচ্ছন্ন সকালটি ছিল ইতিহাসের এক নিপুণ ও নিষ্ঠুর বিশ্বাসঘাতকতার মঞ্চ। ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার মিরপুরে জীবিত আছেন—এমন এক রহস্যময় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত টেলিফোন বার্তার প্ররোচনায় তিনি উদ্ধার অভিযানে ছোটেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অভিযানের ভয়াবহতা এবং জহির রায়হানের পরিণতির সত্যটি দীর্ঘ ২৭ বছর রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, সামরিক গোপনীয়তা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার চাদরে ঢাকা ছিল। অবশেষে ১৯৯৯ সালে সাংবাদিক জুলফিকার আলি মাণিকের অকুতোভয় অনুসন্ধানে দৈনিক ‘ভোরের কাগজ’-এ প্রকাশিত হয় সেই অভিযানের লোমহর্ষক দালিলিক সত্য। সেই অভিযানে অংশ নেওয়া দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের তৎকালীন সুবেদার মেজর হাফিজ উদ্দিন আহমেদ দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে জনসমক্ষে জবানবন্দি দেন। তিনি স্বচক্ষে দেখেছিলেন, ৩০ জানুয়ারি সকাল আনুমানিক ১১টার দিকে মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের নর্থ টাউন হলের কাছে ওত পেতে থাকা বিহারি ও পাকিস্তানি সৈন্যদের অতর্কিত ‘অ্যাম্বুশে’ কীভাবে জহির রায়হান গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়েছিলেন। সেই ভয়াবহ সম্মুখ সমরে ৪২ জন পুলিশ এবং অন্তত ৩৫ জন সেনাসদস্য শহীদ হন। বধ্যভূমির সেই রক্তভেজা মাটিতেই অগণিত শহীদের সাথে মিশে গিয়েছিল এই দ্রোহী শিল্পীর নশ্বর দেহ।


​বর্তমান এই অস্থির ও কুহেলিকাচ্ছন্ন সময়ে জহির রায়হানের প্রাসঙ্গিকতা কোনো মরচে পড়া ইতিহাসের অধ্যায় নয়, বরং এক প্রদীপ্ত জবানবন্দি। আজ যখন সত্য ও মিথ্যার সীমানা ঝাপসা হয়ে আসে, যখন বুদ্ধিবৃত্তিক মেরুদণ্ড আপসের ভারে ন্যুব্জ, তখন জহির রায়হান আমাদের শেখান কীভাবে শিল্পের আঙিনাকে প্রতিরোধের দুর্গে রূপান্তরিত করতে হয়। তাঁর মরদেহ পাওয়া যায়নি বলে কোনো ভৌগোলিক সীমানায় তাঁর সমাধি রচিত হয়নি; বরং তাঁর সমাধি রচিত হয়েছে এ দেশের প্রতিটি প্রগতিশীল আন্দোলন এবং শোষণের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের অবিনাশী চেতনার মাঝে। তিনি প্রমাণ করেছেন যে, রাইফেলের নলের চেয়েও ক্যামেরার লেন্স এবং কলমের নিব অনেক বেশি শক্তিশালী হতে পারে যদি তার পেছনে একটি দায়বদ্ধ মস্তিষ্ক থাকে। বর্তমানের এই দিশেহারা সময়ে জহির রায়হান একটি ‘আদর্শিক কম্পাস’, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—অন্ধকার যত গভীরই হোক, সত্যের মশাল হাতে একাকী পথচলাই হলো প্রকৃত শিল্পীর ধর্ম। জহির রায়হান তাই কেবল একটি নাম নয়; তিনি অধিকার আদায়ের এক বৈশ্বিক দর্শন এবং এক নক্ষত্রসম শিল্পীর অনন্তকালীন রাজনৈতিক ও নান্দনিক উত্তরাধিকার।





এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?