- প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৭:১৯ পিএম
একটি কলমের নীরবতা এবং কিছু না বলা হাহাকার: সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির অন্তিম যাত্রা: আরিফ রহমান
যে হাতটি দীর্ঘ তিন দশক ধরে বরিশালের মানুষের সুখ-দুঃখ, অন্যায়-অবিচার আর অধিকারের কথা সাদা কাগজে ফুটিয়ে তুলেছে, সেই হাতটি যে এভাবে একদিন নিথর হয়ে যাবে, তা হয়তো ভাবেনি কেউ। গত ১১ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর প্যারারা রোডের দৈনিক সমকাল ব্যুরো অফিস থেকে উদ্ধার করা হয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক পুলক চ্যাটার্জির ঝুলন্ত মরদেহ। ৫৭ বছর বয়সী এই নির্ভীক সংবাদযোদ্ধার এমন আকস্মিক প্রস্থান কেবল বরিশালের গণমাধ্যম অঙ্গনেই শোকের ছায়া ফেলেনি, বরং সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে এক নির্মম বাস্তবতাকে।
অফিসের সেই চেনা ঘর, যেখানে থমকে গেল সময়সমকালের বরিশাল ব্যুরো অফিসটি ছিল পুলক চ্যাটার্জির দীর্ঘদিনের চেনা ঠিকানা। চাকরি থেকে অব্যাহতি পাওয়ার পরও প্রায়ই তিনি এই চেনা আঙিনায় আসতেন। কিন্তু সেই অফিস কক্ষই যে তাঁর জীবনের শেষ আশ্রয়স্থল হবে, তা কে জানত? দরজা ভেঙে যখন পুলিশ তাঁর নিথর দেহ উদ্ধার করে, তখন তাঁর শার্টের বুক পকেটে পাওয়া যায় পাঁচটি চিরকুট। সেই চিরকুটগুলো যেন এক একজন সৎ ও আজীবন লড়াই করে যাওয়া মানুষের ভেতরের জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসের দলিল।
চিরকুটের অক্ষরে অক্ষরে লুকিয়ে থাকা বেদনাপকেটে পাওয়া সুইসাইড নোটগুলোতে লুকিয়ে ছিল তাঁর জীবনের শেষ দিনগুলোর তীব্র মানসিক যন্ত্রণা, দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থতা এবং বেকারত্বের গ্লানি। স্ত্রী প্রিয়াঙ্কা চ্যাটার্জি ও একমাত্র কন্যা প্রকৃতির উদ্দেশ্যে তিনি লিখেছেন, “আমাকে ক্ষমা করে দিও। পৃথিবীতে কারও জন্য কিছু থেমে থাকে না।
”দীর্ঘদিনের সহকর্মী সুমন চৌধুরীর কাছে লেখা চিরকুটে তিনি নিজের কোনো ক্ষোভের কথা বলেননি, বরং শেষ অনুরোধে জানিয়েছেন যেন সমকাল কার্যালয়ে আটকে থাকা তাঁর বকেয়া পাওনা অর্থ উদ্ধার করে তাঁর স্ত্রীর হাতে পৌঁছে দেওয়া হয় (তাঁর মৃত্যুর তিন দিন পর সমকাল কর্তৃপক্ষ সেই ১০ লাখ টাকা পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে)। অন্য একটি নোটে তিনি লিখেছেন, “আমি বেশ কিছু রোগে ভুগছিলাম। এই কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।
”পেশাগত অনিশ্চয়তা ও এক নিঃসঙ্গ লড়াইযিনি জীবনের সোনালী সময়গুলো বিলিয়ে দিয়েছেন দৈনিক যুগান্তর ও দৈনিক সমকালের মতো শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমে, যিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন বরিশাল প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে, তাঁর শেষ দিনগুলো কেটেছে চরম নিঃসঙ্গতা ও বেকারত্বের কষ্টে। ২০২৩ সালের মে মাসে চাকরি হারানোর পর থেকেই এক অজানা মানসিক সংকটে ভুগছিলেন এই গুণী সাংবাদিক। সমাজকে আলোর পথ দেখানো একজন মানুষের নিজের জীবনই যে কতটা অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল, তা হয়তো তাঁর চারপাশের চেনা সমাজ সময়মতো টের পায়নি।
একটি নক্ষত্রের বিদায়গত শনিবার বিকেলে বরিশাল কেন্দ্রীয় শ্মশানে তাঁর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। এর আগে তাঁর মরদেহ বরিশাল প্রেস ক্লাবে নেওয়া হলে সহকর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং সাধারণ মানুষের চোখের জলে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
তাঁর এই প্রস্থান কেবল একজন ব্যক্তির চলে যাওয়া নয়, এটি বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের এক জ্বলন্ত উদাহরণ। পুলক চ্যাটার্জি চলে গেছেন, তাঁর কলমটি আজ আজীবনের জন্য নীরব। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া শূন্যতা এবং বুক পকেটের সেই পাঁচটি চিরকুট বরিশালের প্যারারা রোডের বাতাসকে আরও দীর্ঘকাল ভারী করে রাখবে। ওপারে ভালো থাকবেন, শব্দ ও সত্যের কারিগর।
আরিফ রহমান
লেখক ও গবেষক আজীবন সদস্য, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট।
এই বিভাগের আরো খবর
-
রুস্তম ফারাজী, কেশবপুর।বাংলাদেশ পুলিশ ক্যাডারে প্রথম স্থান অধিকার করে দেশের গৌরবময় এক অর্জনের স্বাক্ষর রেখেছেন কেশবপুরের কৃতি সন্তান বাচ্চু রহমান।...
-
নিজস্ব প্রতিবেদক, গোপালগঞ্জ : বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ ফুটবলে গোপালগঞ্জে ঘরের মাঠে স্বাগতিক ব্রাদার্স ইউনিয়নকে উড়িয়ে দিয়েছে সিটি ক্লাব। অতিথিদের কাছে...
অনলাইন ভোট
-
-
মায়ের জানাজার সময় গাজীপুরের বিএনপি নেতা আলী আজমকে হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখার ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে বলেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আপনি কি মনে করেন?
-
-
খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও ছাড় দিয়েছে। এতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ কমবে বলে আপনি কি মনে করেন?
খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?
এখনই সাবস্ক্রাইব করুন প্রিয় বিষয়ের নিউজলেটার!