দেশে পাঁচ বছরে ৭৩ হাজারের বেশি আত্মহত্যা, বরিশালেও এক বছরে ২০০; ঝুঁকিতে তরুণ-শিক্ষার্থীরা
সারা দেশে আত্মহত্যার সংখ্যা বৃদ্ধির পাশাপাশি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বরিশাল বিভাগে তরুণ ও শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাও। একটি বেসরকারি সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে গত এক বছরে প্রায় ২০০ জন আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে নারী প্রায় ৩৪ শতাংশ এবং পুরুষ ৬৬ শতাংশ।
বাংলাদেশে সরকারি চাকরির পেছনে তীব্র প্রতিযোগিতা, বেকারত্ব, পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ, পারিবারিক অশান্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন, গভীর একাকীত্ব, মাদকাসক্তি, অভিভাবকের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, অপমান এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মতো নানা সামাজিক ও পারিবারিক চাপের পাশাপাশি বিষণ্নতা, উদ্বেগ, ট্রমা, যৌন নিপীড়নসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও তরুণদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলছে। বহুমাত্রিক এই সংকটে ঝুঁকিতে পড়ছে দেশের তরুণ সমাজ।
শিক্ষাজীবন শেষ করেও কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব এবং পারিবারিক ও সামাজিক চাপ সামলাতে গিয়ে অনেক তরুণ-তরুণী তীব্র মানসিক সংকটে পড়ছেন। এসব পরিস্থিতি তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে।
দেশের পুলিশ ও সরকারি ও বিভিন্ন গবেষণার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে দেশে ৭৩ হাজারের বেশি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে।
২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দেশে ৭৬ হাজার ৩৬১ জন আত্মহত্যা করেছেন বলে একটি সরকারি পরিসংখ্যানে উঠে এসেছে। অন্য একটি পরিসংখ্যানে এ সংখ্যা ৭৩ হাজার ৫৯৭ জন। অর্থাৎ, হিসাবভেদে গত পাঁচ বছরে দেশে প্রতিবছর গড়ে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করেছেন।
জাতীয় পর্যায়ে আত্মহত্যার ঘটনায় শীর্ষে থাকা জেলাগুলোর বাইরে বরিশাল বিভাগেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। বরিশাল রেঞ্জ পুলিশের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের প্রথম চার মাসে—জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত—বিভাগের ছয় জেলায় আত্মহত্যা করেছেন ১৮৭ জন। তাদের মধ্যে ১৩৫ জন গলায় ফাঁস দিয়ে এবং ৫২ জন বিষপানে আত্মহত্যা করেন।
পুলিশের তথ্যমতে, জেলাভিত্তিক হিসাবে আত্মহত্যার ঘটনায় এগিয়ে রয়েছে যশোর। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ জেলায় আত্মহত্যার ঘটনায় ১ হাজার ৪৫৪টি মামলা হয়েছে। যশোরের পর আত্মহত্যার ঘটনায় বেশি মামলা হওয়া জেলাগুলোর তালিকায় রয়েছে ঢাকা, কুমিল্লা, দিনাজপুর, বগুড়া, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া, পাবনা, ঝিনাইদহ ও নওগাঁ।
পুলিশের দাবি, আত্মহত্যা বা আত্মহত্যার চেষ্টার সব ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না, এমনকি অনেক ঘটনা নথিভুক্তও হয় না। আবার কিছু ক্ষেত্রে হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা হিসেবে দেখানোর ঘটনাও ঘটতে পারে।
‘বাংলাদেশ জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ২০২৬-২০৩০ (খসড়া)’ অনুযায়ী, ১৫-১৭ বছর বয়সী নারী এবং ১৮-২৪ বছর বয়সী পুরুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। কেবল ২০২৩ সালেই ২০ হাজার ৫০৫ জন আত্মহত্যা করেন, যা সড়ক দুর্ঘটনার পরই সর্বোচ্চ।
বেসরকারি একটি সংগঠনের গবেষণা অনুযায়ী, ২০২৫ সালেই দেশে ৪০৩ জন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশের বয়স ছিল ১৩ থেকে ১৯ বছরের মধ্যে। গবেষণায় হতাশা, অভিমান, পড়াশোনার চাপ, সম্পর্কের জটিলতা ও পারিবারিক দ্বন্দ্বকে বিভিন্ন কারণ হিসেবে উঠে এসেছে।
২০২২ সালে দেশে আত্মহত্যাকারী ৫৩২ জন শিক্ষার্থীর মধ্যেও ৬৪ শতাংশ ছিল স্কুলপর্যায়ের।
পরিসংখ্যানের পাশাপাশি বরিশালে সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাও তরুণ ও শিক্ষার্থীদের মানসিক সংকটের চিত্র সামনে এনেছে।
গত ২৩ আগস্ট বরিশালের গৌরনদীতে ১৬ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষার্থী লাবনী আক্তার পরিবারের অমতে বিয়ে করার মাত্র নয় মাসের মাথায় দাম্পত্য টানাপোড়েন ও একাকীত্বের চাপ সইতে না পেরে আত্মহত্যা করেন।
গত ২৫ জুলাই বরিশালের আগৈলঝাড়ায় ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য শিলা আক্তার (৩৯) দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহননের পথ বেছে নেন। এ ঘটনায় অভিযুক্ত স্বামীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের ডবলমুরিং এলাকায় সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা শাহিদ হোসেনের (৪৫) আত্মহত্যার নেপথ্যেও বিষণ্নতা ও একাকীত্বের ছাপ পাওয়া যায়।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ধারাবাহিক মানসিক সংকট ও তরুণদের নিঃসঙ্গতার বড় উদাহরণ বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি)। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসের মধ্যেই ববির অন্তত দুজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
করোনা মহামারি-পরবর্তী গত ছয় বছরে এই একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অন্তত আটজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন, যার নেপথ্যে ছিল বিষণ্নতা, তীব্র একাকীত্ব, শিক্ষাব্যবস্থায় নিয়মিত হতে না পারা ও ক্যারিয়ার নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা।
এছাড়া বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজের (শেবাচিম) শিক্ষার্থী সজীব বাড়ৈ ২০২৫ সালের মে মাসে অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ ও মানসিক বিষাদ সইতে না পেরে চিঠি লিখে আত্মহত্যা করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রচলিত গবেষণাহীন শিক্ষাব্যবস্থা, সরকারি চাকরির সামাজিক উন্মাদনা, পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের চাপ এবং পরিবারের অতিরিক্ত প্রত্যাশা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যে ফাটল ধরাচ্ছে। পাশাপাশি একাকীত্ব, পারিবারিক কলহ ও সম্পর্কের বিচ্ছেদ বড় কারণ হিসেবে দেখা দিচ্ছে।
তবে আত্মহত্যার পেছনে সাধারণত একক কোনো কারণ কাজ করে না। ব্যক্তিভেদে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, পারিবারিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা কিংবা সামাজিক চাপ—একাধিক বিষয় একসঙ্গে ভূমিকা রাখতে পারে।
আইন অনুযায়ী, দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় আত্মহত্যার চেষ্টা সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধ। আত্মহত্যায় প্ররোচনা বা সহায়তায় ৩০৬ ধারায় সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে এবং অপমৃত্যুর তদন্ত করা হয় ১৭৪ ধারায়।
তবে আত্মহত্যার চেষ্টা করা ব্যক্তিকে শাস্তির পরিবর্তে চিকিৎসা ও সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (উন্নয়ন ও গবেষণা) অধ্যাপক ফোয়ারা তাসমিম এবং আইসিডিডিআর,বি-এর বিজ্ঞানী আনীকা তাসনিম হোসেন মানসিক স্বাস্থ্যকে অপরাধ না ভেবে রোগ হিসেবে গণ্য করার তাগিদ দিয়েছেন।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চাইল্ড সাইকোলজিস্ট মোঃ নাজমুল হোসেন বলেন, “বরিশালের মতো স্থানীয় পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। প্রতিটি স্কুল-কলেজে অন্তত একজন প্রশিক্ষিত সাইকোলজিস্ট ও ‘Mental Health Corner’ চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিভাবকদের প্যারেন্টিং দক্ষতা, সন্তানের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কথা বলার কৌশল, অতিরিক্ত চাপ ও অন্যের সঙ্গে তুলনা করার প্রবণতা কমানো এবং সন্তানের আচরণে মানসিক সমস্যার সতর্কসংকেতগুলো কীভাবে শনাক্ত করতে হবে—এসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি।
পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার সমন্বিত উদ্যোগের পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক চর্চার ইতিবাচক পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে তরুণদের আত্মহত্যার ঝুঁকি কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আত্মহত্যা প্রতিরোধে প্রয়োজন শুধু সংকটের পর ব্যবস্থা নেওয়া নয়; বরং সংকটে পড়ার আগেই তরুণদের পাশে দাঁড়ানো, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করা এবং পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা।