আজ সোমবার অনুষ্ঠিত হবে গোপালগঞ্জের ওড়াকান্দির বারুনী স্নানোৎসব
নিজস্ব প্রতিবেদক, গোপালগঞ্জ : দশলক্ষাধিক মতুয়া ভক্তের অংশগ্রহণে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার ওড়াকান্দির ঠাকুর বাড়ীতে আজ সোমবার (১৬ মার্চ) থেকে শুরু হচ্ছে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মতুয়া সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ মহা বারুনীর স্নান উৎসব ও তিন দিনব্যাপী বারুনী মেলা। পূর্ণ্য লাভের আশায় দেশ ও বিদেশের লাখ লাখ মতুয়া ভক্তরা এ পূর্ণ স্নানে অংশ নিবেন। এ স্লাণ উপলক্ষে বসবে তিন দিনব্যপি গ্রামীন মেলা।
মতুয়া মহাপুরুষ শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথি উপলক্ষে এই স্নান উৎসব হয়ে আসছে ২০০ বছর আগের থেকে। তিথি অনুযায়ী আজ সোমবার (১৬ মার্চ) সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে শুরু হবে এই স্নান। চলবে পরের দিন মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) সকাল পৌনে ৯টা পর্যন্ত। এ উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী মেলা চলবে পরের দিন বুধবার ( ১৮ মার্চ) বিকেল পর্যন্ত। মেলায় দেশজ, কুটির শিল্প, মৃৎ শিল্প, খেলনাসহ বিভিন্ন খাদ্য ও মিষ্টির দোকান বসবে।
এবছর ১৭ মার্চ বৃহস্পতিবার ব্রক্ষ্মমূহুর্তে বাংলাদেশ মতুয়া মহাসংঘের মহাসংঘাদিপতি ও ঠাকুর পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠ শ্রীমতি সীমাদেবী ঠাকুরের নেতৃত্বে মঙ্গলপ্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও পূজাঅর্চণা এবং কামনা সাগরে স্নান করে স্নান দেশ ও দশের মঙ্গল কামনায় প্রার্থণা করবেন। ভক্তরা মন্দিরে পূজাঅর্চনা শেষে ঠাকুর বাড়িতে অবস্থিত কামনা সাগর ও শান্তি সাগরে (মুলতঃ বড় পুকুর) স্নান করে ঠাকুরের কাছে পাপ থেকে মুক্তি, পুন্য লাভ ও দেশবাসীর মঙ্গল প্রার্থনা করে থাকেন।
এর আগে, সারা দেশ থেকে লাখ লাখ মতুয়াভক্ত ঢাক, ঢল বাজিয়ে উলুধ্বনি দিয়ে ঠাকুর বাড়ীতে আসবে। এবছর শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ২১৫তম জন্মতিথি। প্রতিবছর ফাল্গুন মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে পাপ থেকে মুক্তি ও পূণ্য লাভের আশায় দেশের বিভিন্ন জেলা ছাড়াও ভারতসহ দেশ বিদেশের প্রায় ১০ লাক্ষাধিক পূর্ণাথী অংশ নিবেন এ স্নান উৎসবে। এ উপলক্ষে ওড়াকান্দির ঠাকুর বাড়ীর আশাপাশ এলাকার অন্তঃত ৫ কিলোমিটার এলাকাসহ সারা জেলা জুড়ে উৎসবের আমেজ বিরাজ করে থাকে।
এদিকে স্নান ও মেলা সঠিকভাবে পালন করতে গোপালগঞ্জ-০১ আসনের সংসদ সদস্য সেলিমুজ্জামান মোল্যা, গোপালগঞ্জ-০২ আসনের ডাক্তার কে এম বাবরসহ প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার সভা করে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের সিধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে সংসদ সদস্য ডাক্তার কে এম বাবর, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক, জেলা প্রশাসক মোঃ আরিফ- উজ- জামান, পুলিশ সুপার মোঃ হাবিবুল্লাহসহ পদস্থ কর্মকর্তাগণ ওড়াকান্দির উৎসব স্থল পরিদর্শন করেছেন।
স্নানোৎসব কমিটির সভাপতি ও শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের ষষ্ঠ পুরুষ শ্রী অমিতাভ ঠাকুর বলেন, এ উৎসবকে ঘিরে ভক্তদের থাকার ও প্রসাদের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের পাশাপাশি মতুয়া সংঘের প্রায় ছয় শতাধিক স্বেচ্ছাসবক ভক্তদের থাকা খাওয়া, ঠাকুর বাড়িতে প্রবেশ ও বাহির হওয়ার সহ সার্বিক দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া স্নান করার সময় কোন ভক্ত যতি অসুস্থ হয়ে পড়েন সেজন্য একাধিক মেডিকেল টিম প্রস্তুত থাকবে। আশাকরি অনুষ্ঠানটি সুন্দর ও সঠিক ভাবে সম্পন্ন করতে পারবো।
ঠাকুর পরিবারের তন্যতম সদস্য ও কাশিয়ানী উপজেলা পরিষদের একাধিকবার নির্বাচিত সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সুব্রত ঠাকুর বলেন, দেশ বিদেশের অন্তঃত দশ লক্ষাধিক মানুষ ওড়াকান্দির বারুনী মেলা ও স্নান উৎসবে যোগ দিতে আসবেন। আমরা এখন ষষ্ঠ পুরুষ হিসেবে এই অনুষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছি। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা সকল মানব জাতির শান্তি কামনা করে প্রার্থণা করে থাকি। এবারও সেটা হবে।
ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক বলেন, আমি ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি পরিদর্শন করেছি। কমিটির লোকজনের সঙ্গে কথা হয়েছে। মতুয়া ভক্তদের অনুষ্ঠানটি যাতে শান্তিপূর্ন ভাবে সম্পন্ন হয় সে বিষয়ে পুলিশ বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। স্নান উৎসব শুরু হবে ১৬ মার্চ। এর আগে ১৫ মার্চ সকাল থেকে ১৮ মার্চ বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় চারশত পুলিশ সদস্যের সমন্বয়ে বেশ কয়েকটি ইউনিট শিপটিং পদ্বতিতে দায়িত্ব পালন করবেন। কোন ধরনের অপ্রিতিকর ঘটনা এড়াতে সিসি ক্যামেরা সহ ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
এদিকে এ উৎসব নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে শেষ করতে ঠাকুরবাড়ী পরিদর্শন করে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোঃ আরিফ-উজ-জামান। তিনি বলেন, ঠাকুর বাড়ি এলাকায় সুউচ্চ পর্যবেক্ষন চৌকি ও প্রবশপথসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অর্ধশতাধিক সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। র্যাব, পুলিশসহ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। এ বিষয়ে আয়োজক কমিটির সঙ্গে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার সভা করেছে। সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে লাখ লাখ মতুয়া ভক্তের স্নানোৎসবটি সম্পন্ন করতে প্রশাসন কাজ করছে।
উল্লেখ্য, শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর ও তাঁর ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুরের জন্মস্থান কাশিয়ানী উপজেলার এই ওড়াকান্দি গ্রাম। তাদের অনুসারী ভক্তদের বলা হয় মতুয়া ভক্ত। বিশ্বের কোটি কোটি মতুয়া ভক্তদের কাছে ওড়াকান্দি ঠাকুরবাড়ি একটি পবিত্র পুণ্যভূমি। নিম্নবর্ণের হিন্দু সম্প্রদায়ের ত্রাণ কর্তা হিসাবে ১৮১২ খ্রিস্টাব্দের ১১ মার্চ ফাল্গুন মাসের মধুকৃষ্ণা ত্রয়োদশী তিথিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন হরিচাঁদ ঠাকুর। পরবর্তিতে তাঁর ছেলে গুরুচাঁদ ঠাকুর প্রতিবছর হরিচাঁদ ঠাকুরের জন্মতিথিতে স্নানোৎসব ও মেলা শুরু করেন।
এই বাড়িতে ২০২১ সালের ২৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ওড়াকান্দির ঠাকুর বাড়িতে আসেন এবং শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মন্দিরে পূজাঅর্চনা করেন। #