পুলিশ পরিচয়ে টাকা নিয়েও মামলার আসামি যুবলীগ নেতা
নিজস্ব প্রতিবেদক:
বরিশালের আগৈলঝাড়া থানায় হামলার মামলায় আসামি করা হয়েছে দুই সাংবাদিককে। এ নিয়ে যখন বিতর্ক চলছে ঠিক তখনই নতুন করে সামনে এসেছে মামলা বাণিজ্যের অভিযোগ। মামলায় আসামি করা হবে না জানিয়ে ১৯ হাজার টাকা নিয়েও আসামি করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের নেতাকে।
বিকাশের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের কিছু প্রমাণও এসেছে প্রতিবেদকের হাতে। অভিযোগ- থানার পরিদর্শকের (তদন্ত) নাম ব্যবহার করে, হামলা-ভাঙচুরের মামলার বাদী, উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুকের পরিচয়ে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে ওই টাকা।
তবে লেনদেন এবং যেই নম্বর থেকে ফোন করে টাকা দাবি এবং বিকাশে লেনদেন করা হয়েছে দুটি নম্বরই এখন বন্ধ রয়েছে। আর পুলিশ বলছে, বন্ধ থাকা নম্বর দুটি নিলফামারি এলাকার বলে নিশ্চিত হয়েছেন তারা।
এর আগে গত ৯ জুলাই মাদক ও চুরি মামলার আসামির মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে আগৈলঝাড়া থানায় হামলা-ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধর করে গ্রেপ্তার রিয়াজ ফকিরের স্বজনরা। ওই ঘটনায় ৪৩ জনের নামে এবং আরও প্রায় তিনশ জনকে অজ্ঞাত আসামি করে মামলা করেছেন আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক। ওই মামলায় ২৪ নম্বর ক্রমিকে আসামি করা হয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ উপজেলা যুবলীগের নেতা মাহমুদুল ইসলাম সাগর সেরনিয়াবাতকে।
আগৈলঝাড়া উপজেলার সেরাল গ্রামের বাসিন্দা মাহমুদুল ইসলাম সাগর অভিযোগ করে বলেন, থানায় ভাঙচুর ও পুলিশের ওপর হামলার মামলায় আমাকে উদ্দেশ্যেমূলকভাবে আসামি করা হয়েছে। থানায় মামলার আবেদন জমা দেওয়ার পর ওসি স্বাক্ষর দেওয়ার আগেই ০১৯৮৭-২৯৩৪৮৬ নম্বর থেকে আমার কাছে ৯ জুলাই ফোন আসে।
নিজেকে মামলার বাদী এবং আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) ওমর ফারুক পরিচয় দিয়ে আমাকে জানানো হয় তাকেও মামলায় আসামি করা হচ্ছে। নাম কাটাতে হলে ১০ মিনিটের মধ্যে ৪০ হাজার টাকা পুলিশ পরিদর্শকের (তদন্ত) কাছে পাঠাতে হবে।
সাগর বলেন, আমি বিষয়টিকে প্রথমে প্রতারণা হিসেবেই ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস অর্জনের জন্য পরবর্তীতে ০১৭৮৬-৫৪১০২৭ নম্বর থেকে আমাকে কল দিয়ে ওসি তদন্ত পরিচয় দেয় এবং আমার সঙ্গে কথা বলেন। এমনকি আমার সন্দেহ দূর করার জন্য স্থানীয় গ্রাম পুলিশ, বর্তমান ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম মারুফ ও সাবেক ইউপি সদস্য বাদল সেরনিয়াবাতের মুঠোফোনে ফোন করে কনফারেন্সে আমার সঙ্গে কথা বলেন।
সাগর আরও অভিযোগ করেন, এসআই ও ওসি তদন্তের পরিচয় সনাক্তের পর শুরু হয় দরকষাকষি। মামলা থেকে আমার নাম বাদ দেওয়ার কথা বলে ৪০ হাজার টাকা দাবি করলেও পরে ১৯ হাজার টাকায় সমঝোতা হয়। এরপর ০১৭৮৬-৫৪১০২৭ নাম্বারে দুইবারে ১৫ হাজার ৫ টাকা এবং ৪ হাজার ৫ টাকা করে মোট ১৯ হাজার ১০ টাকা পাঠাই।
তিনি বলেন, ১০ জুলাই মামলাটি থানায় নথিভুক্ত হওয়ার পর জানতে পারি আমার এবং উপজেলা যুবলীগের সভাপতি আজাদ সেরনিয়াবাতকেও আসামি করা হয়েছে। পরে টাকা পাঠানোর নম্বরে কল করা হলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।
প্রশ্ন তুলে সাগর সেরনিয়াবাত বলেন, এজাহারে ওসির স্বাক্ষর হওয়ার পূর্বে সেই অভিযোগের কপি পুলিশ সদস্য ছাড়া বাইরের কারো জানার কথা না। আমার ধারনা মামলার বাদী এবং ওসি তদন্ত এই কাণ্ডের সাথে জড়িত। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তসহ বিচার দাবি করছি। থানায় ভাঙচুরের ঘটনার সাথে আমার কোন সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে প্রশাসন যে শাস্তি দিবে তা মাথা পেতে নেব।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মামলার বাদী, আগৈলঝাড়া থানার উপ-পরিদর্শক ওমর ফারুক। তিনি বলেন, আমার নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ প্রতারণা করতে পারে। ওই ব্যক্তির সঙ্গে অদ্যবধি আমার কোন কথা হয়নি।
এদিকে, বর্তমান ইউপি সদস্য মারুফ সেরনিয়াবাত বলেন, সাগর আমার ভাগিনা। থানার ওসি আমাকে ফোন করে জানিয়েছিল যে, সাগর থানা ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত। আমি তাকে বলেছি ঘটনার সময় সাগর আমার সাথেই ছিল। এরপর ওসি ফোনের সংযোগ কেটে দেন। এর কিছুক্ষণ পরে আবার ওসি ফোন করে জানতে চান কে কে আমার এলাকা থেকে থানায় ভাঙচুর করতে গিয়েছিল। আমি তাদের বলেছি এখান থেকে কেউ জায়নি। আপনারা ফুটেজ দেখে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিন। এছাড়া লেনদেনের বিষয়ে কোন আলোচনা হয়নি। তাছাড়া সাগর আলাদাভাবে যদি লেনদেন করে থাকে সেটা আমার জানা নেই বা সে আমাকে জানায়ওনি।
অপর সাবেক ইউপি সদস্য বাদল সেরনিয়াবাত বলেন, এমন কোন ঘটনার সাক্ষী আমি না। এ বিষয় নিয়ে আমার সাথে পুলিশ বা আসামি কারোর সাথেই কোন আলোচনাই হয়নি। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে আগৈলঝাড়া থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ মাসুদ খানকে তার সরকারি মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে আগৈলঝাড়া থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) সুসংকর মল্লিক বলেন, বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে জেনেছি। যেই নম্বর থেকে লেনদেন এবং যোগাযোগ করা হয়েছে সেই নম্বর দুটি আমরা ট্রেস করেছি। নম্বর দুটির লোকেশন নিলফামারি দেখা গেছে। তবে দুটি নম্বরই বন্ধ পাওয়া গেছে।
তিনি বলেন, হতে পারে প্রতারকরা আমাদের নাম ব্যবহার করে এমন কাজ করেছে। তবে নথিভুক্ত হওয়ার আগে মামলার আবেদন ভাইরে যাওয়ার সুযোগ আছে কীনা এমন প্রশ্নে ওসি তদন্ত বলেন, মামলা কোর্টে যাওয়ার আগপর্যন্ত নথি বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। কিভাবে যে এটা হলো তা বুঝতে পারছি না।
এদিকে- যুবলীগ নেতার কাছ থেকে টাকা আদায়ে ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি কার বা কোথা থেকে সিম দুটি কেনা হয়েছে তা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে একটি ট্রু কলার মোবাইল অ্যাপে নম্বরটি সার্জ দিলে সেখানে ‘এসআই চরফ্যাশন’ লেখা আসে।
তবে এমন ঘটনা জানা নেই বলে জানিয়েছেন, বরিশাল জেলার পুলিশ সুপার এজেডএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এমন কোন অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। যিনি এমন অভিযোগ করেছেন তাকে আমার কাছে বা থানায় লিখিত অভিযোগ দিতে বলেন। তদন্ত করে আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।