- প্রকাশিত: ৯ জুন ২০২৬ ০৩:১৯ পিএম
জননেতা শাহজাহান খানের জীবনগাথা
সঞ্জিব দাস, গলাচিপা, পটুয়াখালী, প্রতিনিধি
পটুয়াখালীর উপকূলীয় জনপদ গলাচিপা উপজেলার চিকনিকান্দি ইউনিয়নের সুতোবাড়িয়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন আলহাজ্ব মোঃ শাহজাহান খান। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন মেধাবী, সাহসী এবং মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ। গ্রামের সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ, সংগ্রাম আর বঞ্চনার চিত্র খুব কাছ থেকে দেখেই তার বেড়ে ওঠা। সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীতে তাকে মানুষের জন্য কাজ করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
যৌবনে তিনি ব্যবসায়িক জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন। পটুয়াখালী শহরের একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি পরিচিতি অর্জন করেন। কিন্তু তার স্বপ্ন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি বিশ্বাস করতেন, একজন মানুষের প্রকৃত সার্থকতা মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করার মধ্যেই নিহিত। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি রাজনীতি ও সমাজসেবার পথ বেছে নেন।
১৯৮৮ সাল থেকে তিনি গলাচিপা ও দশমিনার মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতে শুরু করেন। ধীরে ধীরে তিনি গলাচিপা উপজেলা বিএনপির অন্যতম প্রধান সংগঠক হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠেন। দীর্ঘদিন গলাচিপা উপজেলা বিএনপির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তৃণমূল পর্যায়ে দলকে সুসংগঠিত করেন। তার নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং কর্মীদের প্রতি আন্তরিকতা তাকে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি দলীয় নেতা-কর্মীদের কাছেও অত্যন্ত জনপ্রিয় করে তোলে।
উপজেলা রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে তিনি পটুয়াখালী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও পরবর্তীতে সহ-সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। দলের কঠিন সময়ে তিনি ছিলেন একজন নির্ভরযোগ্য অভিভাবক। রাজনৈতিক প্রতিকূলতা, মামলা-মোকদ্দমা কিংবা আন্দোলন-সংগ্রামের কঠিন মুহূর্ত—সব ক্ষেত্রেই তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মনোনয়নে পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। সংসদ সদস্য হিসেবে তিনি এলাকার উন্নয়ন, শিক্ষা, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেন। কিন্তু ক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছেও তিনি নিজেকে কখনো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে নেননি। তার বাড়ির দরজা সবসময় মানুষের জন্য খোলা থাকত।
রাজনীতির পাশাপাশি সমাজসেবাও ছিল তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি জেলা রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সাধারণ সম্পাদকসহ বিভিন্ন সামাজিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের দুর্দশা তাকে সবসময় ব্যথিত করত। তাই ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস বা যেকোনো দুর্যোগে তিনি মানুষের পাশে দাঁড়াতেন সবার আগে।
পারিবারিক জীবনেও শাহজাহান খান ছিলেন একজন আদর্শ মানুষ। তিনি ছিলেন স্নেহশীল পিতা, দায়িত্বশীল অভিভাবক এবং পরিবারের অবলম্বন। সন্তানদের তিনি সততা, নৈতিকতা এবং মানুষের সেবা করার শিক্ষা দিয়েছেন। রাজনৈতিক ব্যস্ততার মধ্যেও পরিবারের প্রতি তার ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ ছিল অসীম। তিনি সবসময় বলতেন, "মানুষের জন্য কাজ করতে হলে আগে নিজ পরিবারকে আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।"
জীবনের শেষ অধ্যায়েও তিনি ছিলেন আন্দোলন-সংগ্রামের সামনের সারির সৈনিক। ২০২২ সালের ৪ নভেম্বর বরিশালে বিএনপির বিভাগীয় গণসমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার পথে পটুয়াখালী-বরিশাল মহাসড়কের গাবুয়া এলাকায় হামলার শিকার হন। ওই ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং তার কিডনি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর তাকে ঢাকার একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। দীর্ঘ চিকিৎসার পর ২০২২ সালের ২৮ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
তার মৃত্যুর সংবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে গলাচিপা, দশমিনা ও সমগ্র পটুয়াখালীতে শোকের ছায়া নেমে আসে। হাজারো মানুষ তাদের প্রিয় নেতাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে ছুটে আসে। রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে অনেকেই তার মানবিকতা, নেতৃত্ব এবং ত্যাগের কথা স্মরণ করেন।
আজ তিনি শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও তার স্মৃতি, আদর্শ এবং কর্মময় জীবন মানুষের হৃদয়ে অমলিন হয়ে আছে। গলাচিপা ও দশমিনার অসংখ্য মানুষ এখনও তাকে একজন আপসহীন, সাহসী ও জনদরদী নেতা হিসেবে স্মরণ করে। তার জীবনের সংগ্রাম নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে মানুষের জন্য কাজ করতে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং সমাজের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে।
সুতোবাড়িয়ার সেই সন্তান শাহজাহান খান তাই কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন; তিনি ছিলেন একটি সময়ের প্রতীক, মানুষের ভালোবাসায় গড়ে ওঠা এক জননেতা, যার নাম গলাচিপা ও দশমিনার ইতিহাসে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
এই বিভাগের আরো খবর
-
যবিপ্রবি প্রতিনিধি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) আইসিটি সেল এর পরিচালক হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই)...
-
নিজস্ব প্রতিবেদক, ভোলা:ভোলার বোরহানউদ্দিনের সাচরা ইউনিয়নে জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরে একই পরিবারের সদস্যদের ওপর সংঘবদ্ধ হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ...
অনলাইন ভোট
-
-
মায়ের জানাজার সময় গাজীপুরের বিএনপি নেতা আলী আজমকে হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখার ঘটনায় দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে বলেছে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন। এ ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আপনি কি মনে করেন?
-
-
খেলাপি ঋণ কমাতে ব্যাংকঋণ পরিশোধে বাংলাদেশ ব্যাংক আবারও ছাড় দিয়েছে। এতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ কমবে বলে আপনি কি মনে করেন?
খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?
এখনই সাবস্ক্রাইব করুন প্রিয় বিষয়ের নিউজলেটার!