ঈদযাত্রায় এবারও রক্তাক্ত সড়কপথ : চালকদের বেপরোয়া মানসিকতা ও সড়কের অব্যবস্থাপনায় ঝরল ২৩১ প্রাণ
সাকিব উল হক
পবিত্র ঈদুল আযহার আনন্দ ভাগাভাগি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছে দেশের মানুষ। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও স্বস্তির ঈদ ও ফিরতি যাত্রায় বিষাদের কালো ছায়া নেমে এসেছে সড়ক দুর্ঘটনার কারণে। ছুটির শুরু থেকে ফিরতি পথ পর্যন্ত মহাসড়কগুলোতে একের পর এক দুর্ঘটনায় অকালে ঝরে গেছে শত শত তাজা প্রাণ, আর পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন বহু মানুষ। বিশেষ করে ঢাকা-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে এবং ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে রাজধানীমুখী ফিরতি পথে গতির খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের।
ঈদযাত্রা ও ফিরতি পথের রক্তক্ষয়ী পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গত ২১ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ঈদযাত্রায় সারা দেশে ১৯৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৪১ জন নিহত এবং ৫৪০ জন আহত হয়েছেন। সংগঠনটির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বিগত ঈদগুলোর তুলনায় এবার দুর্ঘটনা কিছুটা কম মনে হলেও অব্যবস্থাপনা কাটেনি। যে পথে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টায় যাতায়াত করা সম্ভব, সেখানে যাত্রীদের ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগার মতো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে।
সংবাদমাধ্যম ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ঈদের ছুটির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত দুর্ঘটনার চিত্র ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ:
• সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হতাহত: গত ২৪ ঘণ্টায় কর্মস্থলে ফেরার পথে এবং ঈদের পরবর্তী সময়ে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত এবং ৭৮ জনেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
• ছুটির শুরুর দিকে (২৩ থেকে ২৫ মে): ঈদযাত্রার শুরুর ৩ দিনেই সড়কে প্রাণ হারান অন্তত ৪৮ জন। এর মধ্যে ২৫ মে এক দিনেই সর্বোচ্চ ২৮ জনের মৃত্যু হয়।
• ঈদের দুদিন আগে (২৬ মে): দেশের ৬টি জেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় আরও ২৫-২৬ জনের মৃত্যু হয়।
• ঈদের দিন (২৮ মে): ঈদের দিন দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হন।
• ঈদের পরের দিনগুলো ও ফিরতি যাত্রা: ঈদের নামাজ শেষে এবং ফিরতি যাত্রায় কুষ্টিয়া, পটুয়াখালী, ফরিদপুর ও যশোরসহ বিভিন্ন জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ফরিদপুরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২ জন, যশোরে ২ যুবক, পটুয়াখালীতে ১ জন কিশোর এবং কুষ্টিয়ায় ১ জন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন।
এবারের ফিরতি পথের মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৪০.৫০% ঘটনাই ঘটেছে মোটরসাইকেলের কারণে, যাতে ৩২ জন আরোহী প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটে যাওয়া কিছু দুর্ঘটনা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে:
• গৌরনদীতে বাস দূর্ঘটনা: আজ ১ জুন সোমবার ভোরে ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের বরিশালের গৌরনদী উপজেলার আশোকাঠী এলাকায় 'চাঁদনী ট্রাভেলস' নামের একটি দ্রুতগতির বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি পিকআপ ভ্যানকে ধাক্কা দিয়ে খাদে পড়ে যায়। এখন পর্যন্ত নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৪ জন যাত্রী গুরুতর আহত হবার তথ্য পাওয়া গেছে।
• টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে ১৫ শ্রমিকের মৃত্যু: সামান্য অর্থ সাশ্রয়ের আশায় ঝুঁকি নিয়ে রডবাহী ট্রাকে চড়ে বাড়ি ফেরার পথে টাঙ্গাইলে ট্রাক উল্টে ১৫ জন শ্রমিক প্রাণ হারিয়েছেন।
• নরসিংদীতে ট্রেনের নিচে কাটা: নরসিংদীতে ট্রেনে কাটা পড়া স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ কাঁধে নিয়ে এক ব্যক্তির ছুটে চলার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ পুরো দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
• বাটাজোরে একই পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু: ঈদের ঠিক আগের দিনগুলোতে গৌরনদীর বাটাজোরে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় একই পরিবারের শিশুসহ ৩ জন প্রাণ হারান।
• ফরিদপুরে দুই বন্ধুর মৃত্যু: ফরিদপুর-ভাঙ্গা মহাসড়কের নগরকান্দা এলাকায় প্রাইভেটকার ও মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে ২ জন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হন।
• যশোরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা: ৩১ মে রাতে যশোরের মণিরামপুরে কর্মস্থলে ফেরার পথে মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সাথে ধাক্কা লাগলে ২ জন যুবক নিহত হন।
• অন্যান্য জেলা: চুয়াডাঙ্গা, নরসিংদী, বগুড়া ও সিলেটে ইজিবাইক, প্রাইভেটকার ও বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে এবং দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ির পেছনে ধাক্কায় আরও অন্তত ৬ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন এবং সড়ক নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, মহাসড়কে অনেক যানবাহনের গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটারেরও বেশি, যদিও সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সর্বোচ্চ গতিসীমা ৮০ কিলোমিটার। ওভারটেকিং এবং প্রতিযোগিতামূলক যান চালানোই দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। এবারের ঈদযাত্রায় সড়ক পথে দূর্ঘটনার মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে :
১. বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিং: অতিরিক্ত আয়ের আশায় চালকদের বেপরোয়া গতি, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং ওভারটেকিংয়ের প্রতিযোগিতা।
২. কালবৈশাখী ও বৃষ্টির প্রভাব: হঠাৎ ঝড় ও বৃষ্টির কারণে মহাসড়ক পিচ্ছিল হয়ে যাওয়া, যার ফলে চালকেরা ব্রেক চেপে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারছেন না।
৩. মোটরসাইকেল ও ইজিবাইকের আধিক্য: গণপরিবহনের অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে এবং দ্রুত পৌঁছাতে ট্রাফিক আইন না মেনে হাজার হাজার মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলার দূরপাল্লার মহাসড়কে ঝুঁকিপূর্ণভাবে চলাচল করছে।
৪. চালকের ক্লান্তি ও শিথিলতা: দীর্ঘ সময় ধরে একটানা গাড়ি চালানো এবং ফিরতি পথে মহাসড়কে ট্রাফিক আইনের শিথিলতা।
বাংলাদেশ রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান বলেন, "নিয়ন্ত্রণকারী ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থাপনা কাঠামোতেই বড় ধরনের ত্রুটি রয়েছে। এই কাঠামো দিয়ে কোনোভাবেই নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।"