শিরোনামঃ

৬৩ বছরেও মেলেনি বাবার পরিচয়, পৈতৃক শিকড়ের সন্ধানে বাবুল খানের দীর্ঘ লড়াই


সোহাগ হাওলাদার,বরগুনা 

জীবনের ৬৩টি বছর পেরিয়ে গেলেও আজও বাবার পরিচয় নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন বাবুল খান। কে তাঁর বাবা, কোথায় তাঁর পৈতৃক শিকড়, কেমন ছিল বাবার পরিবার এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ সময়। বয়সের ভারে নুয়ে পড়লেও বাবার পরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা আজও শেষ হয়নি। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে নিজের শিকড়ের সন্ধান পাওয়াই এখন তাঁর সবচেয়ে বড় চাওয়া। 


জানা যায়, বাবুল খানের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাজীরাবাদ ইউনিয়নের চান্দখালী গ্রামে। তাঁর ভাষ্য, শৈশবে মায়ের সঙ্গে জীবিকার তাগিদে বরগুনা ছেড়ে খুলনায় চলে যেতে হয় তাঁকে। তখন বাবার পরিচয় বোঝার মতো বয়স হয়নি। কিছুটা বড় হওয়ার পর মায়ের কাছে বারবার বাবার পরিচয় জানতে চাইতেন। একপর্যায়ে জানতে পারেন, তাঁর বাবার নাম আমির খান এবং তাঁদের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাজীরাবাদ ইউনিয়নের চান্দখালী গ্রামে। 


কিন্তু বাবার পরিচয় জানার আগেই মাত্র ১৩ থেকে ১৪ বছর বয়সে মাকে হারান বাবুল। এরপর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে খুলনায় বেড়ে ওঠেন তিনি। মাকে হারানোর পর বাবার পরিচয় জানার আকাঙ্ক্ষা আরও তীব্র হলেও সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া সহজ ছিল না। 


দীর্ঘ অপেক্ষার পর ২০১০ সালের দিকে বাবার পরিচয় ও পরিবারের সন্ধানে খুলনা থেকে বরগুনায় আসেন বাবুল খান। তবে নিজের বাবার বাড়িতে গিয়ে প্রত্যাশিত পরিচয় ও স্বীকৃতি পাওয়ার পরিবর্তে লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তাঁর। এরপরও হাল ছাড়েননি। বাবার পরিচয় জানার আশায় বারবার চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। এমনকি দুইবার কাজীরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করেছেন বলেও জানান তিনি। 


বাবুল খান বলেন, “আমার মা ছিলেন বাবা আমির খানের দ্বিতীয় স্ত্রী। বাবার প্রথম স্ত্রীর ঘরে একটি মেয়ে ছিল। বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লে সৎ বোনের অত্যাচার থেকে আমাকে রক্ষা করতে অন্য চাচাদের পরামর্শে মা ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হন। পরে বাবার পরিচয়ের জন্য দুইবার ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করেছি। তারপরও আমার সৎ বোনের সন্তানদের কাছ থেকে ‘জারজ সন্তান’ বলে গালাগাল শুনতে হয়েছে।” 


বাবার পরিচয় বাবুল খানের কাছে শুধু একটি নাম নয় এটি তাঁর শিকড়। পারিবারিক ইতিহাস ও অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গভীর আকাঙ্ক্ষা। দীর্ঘ ছয় দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি। বাবার পরিচয়ের সন্ধানে এখনো মৃত আমির খানের কবরের পাশে গিয়ে দাঁড়ান তিনি। 


বাবুল খানের চাচাতো ভাই মোজাম্মেল খান বলেন, “বাবুল খান আমির খানের দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান। তাঁর জন্মের পর পরিবারের পক্ষ থেকে হুমকির মুখে পড়ে তাঁকে নিয়ে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর মা। দীর্ঘ বছর পর ফিরে এসেও বাবার পরিচয় পাচ্ছেন না তিনি। আমরা জানি, বাবুল খান প্রকৃতপক্ষে আমির খানের ছেলে। বাবার পরিচয় পাওয়া তাঁর অধিকার।” 


আরেক চাচাতো ভাই আবু খান বলেন, “বাবুল খান আমির খানের ছেলে। তাঁর জন্মের পর তাঁর মাকে সৎ মেয়ের অত্যাচারের মুখে পড়তে হয়েছিল। এ কারণে আমাদের পরামর্শে একপর্যায়ে তাঁকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয়। এখন বাবুল খান পৈতৃক ভিটায় ফিরে এসেছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, তিনি বাবার পরিচয় থেকেও বঞ্চিত। আমরা চাই, তিনি বাবার পরিচয় ফিরে পান এবং পৈতৃক ভিটায় নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারেন।” 


জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে বাবুল খানের প্রত্যাশা, তাঁর বাবার পরিচয় ও পারিবারিক ইতিহাসের সত্যতা একদিন সবার সামনে স্পষ্ট হবে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে অন্তত নিজের শিকড়ের সন্ধান এবং পরিবারের স্বীকৃতি নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে চান বাবুল খান।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?