দেশের শিক্ষার সিঁড়িতে বড় ভাঙন: এসএসসি পেরিয়েও অনার্সে পৌঁছাতে পারছে না লাখো শিক্ষার্থী, বাড়ছে বেকারত্বের শঙ্কা
দেশের শিক্ষার সিঁড়িতে বড় ভাঙন: এসএসসি থেকে স্নাতকে পৌঁছানোর আগেই ঝরে পড়ছে লাখো শিক্ষার্থী, বাড়ছে বেকারত্বের শঙ্কা
দেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা। তবে এই ড্রপআউটের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক সংকটই নয়, বরং সবচেয়ে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে "উচ্চশিক্ষা শেষ করেও বেকার থাকার চরম শঙ্কা"। কর্মমুখী শিক্ষার অভাব এবং চাকরির বাজারের তীব্র অনিশ্চয়তার কারণে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে তরুণ প্রজন্ম। এর ফলে শুরুতেই ধাক্কা খাচ্ছে এসএসসি ও এইচএসসি স্তরের শিক্ষার্থীরা, যার ধারাবাহিকতা পরবর্তীতে গিয়ে ঠেকছে অনার্স বা স্নাতক পর্যায়েও। এসএসসি পাসের পর এবং এইচএসসি পরীক্ষার চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছানোর আগেই শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে গড়ে ৩০ থেকে ৩৬ শতাংশ শিক্ষার্থী। সর্বশেষ শিক্ষা বোর্ড ও সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এসএসসি পাস করার পর থেকে এইচএসসি পরীক্ষার শুরু পর্যন্ত মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে দেশের সর্বমোট ৭ লাখ ২৪ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা থেকে ছিটকে পড়েছে। শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞরা একে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি বড় 'মহাধস' হিসেবে দেখছেন।
বাংলাদেশ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC)-এর ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের তুলনামূলক তথ্য ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ডিগ্রির পেছনে সময় ও অর্থ নষ্ট করে শেষ পর্যন্ত বেকার বসে থাকার চেয়ে শিক্ষার্থীরা মাঝপথেই উপার্জনের বিকল্প পথ বেছে নিচ্ছে।
একাদশ শ্রেণিতে পা দেওয়ার আগেই ছিটকে পড়ার হার
ঝরে পড়ার এই বিশাল মিছিল শুরু হচ্ছে মূলত এসএসসির ফল প্রকাশের পরপরই। বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির অফিশিয়াল পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছিল ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় অনলাইন একাদশ শ্রেণি ভর্তি সিস্টেম (XI Class Admission) এর তথ্য অনুযায়ী,
২০২৫ শিক্ষাবর্ষে এসে দেখা যায় যে, তাদের মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার ২২১ জন (১০.৭৭%) শিক্ষার্থী একাদশ শ্রেণিতে বা উচ্চমাধ্যমিকের কোনো কোর্সে ভর্তিই হয়নি।
অন্যদিকে, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ব্যাপকভাবে কমে নামায় ২০২৬ সালে একাদশে ভর্তির সংখ্যা আরও হ্রাস পায়। শিক্ষা বোর্ডের প্রথম দিনের অনুপস্থিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মাধ্যমিক পরীক্ষার প্রথম দিনেই ২৫ হাজার ৪০৮ জন পরীক্ষার্থী অনুপস্থিত ছিল, যা পরে ২৯ হাজারে গিয়ে ঠেকায় চূড়ান্ত পরীক্ষার স্তরেই ঝরে পড়ার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। স্বল্প শিক্ষিতদের জন্য বাজারে যে ধরনের ছোটখাটো কাজের সুযোগ আছে, উচ্চশিক্ষিতদের জন্য সেই কর্মসংস্থান নেই—এমন ধারণা থেকেই মূলত এই স্তরে বড় একটি অংশ পড়াশোনায় ইস্তফা দিচ্ছে।
এইচএসসি পরীক্ষার আগেই নিখোঁজ সাড়ে ৫ লাখ পরীক্ষার্থী
এসএসসির গণ্ডি পেরিয়ে যারা উচ্চমাধ্যমিকে ভর্তি হয়েছিল, সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি এসেছে সেখানে। ঢাকা শিক্ষা বোর্ড ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের বিগত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডগুলোতে পাসের হার মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়ে ৫৮.৮৩% এ নেমে আসে। পাসের এই মহাধস দেখে পরবর্তী ব্যাচের পরীক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরণের মানসিক ভীতি ও সেশনজটের হতাশা তৈরি হয়।
এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের ২ জুলাই থেকে শুরু হওয়া এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সর্বশেষ প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিয়মিত নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫ লাখ ৪৩ হাজার ৯৮৯ জন (৩৬.৪৩%) শিক্ষার্থী ফরম পূরণই করেনি। শিক্ষা বোর্ডগুলোর অফিশিয়াল ডাটা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে (BTEB), যেখানে ঝরে পড়ার হার সর্বোচ্চ ৫৪%। এছাড়া মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে ৪৪.০৭% এবং সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডে এই হার ৩৩.০৪%। দীর্ঘমেয়াদী পড়াশোনার পেছনে অর্থ ও সময় বিনিয়োগকে পরিবারগুলো এখন 'ঝুঁকিপূর্ণ' মনে করছে, কারণ পড়াশোনা শেষ করলেও দেশে চাকরির কোনো গ্যারান্টি নেই।
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ডিগ্রি না কেটেই নিখোঁজ
উচ্চমাধ্যমিকের বৈতরণী পার হয়ে যারা দেশের বৃহত্তম বিদ্যাপীঠ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের (NU) অধিভুক্ত কলেজগুলোতে অনার্সে ভর্তি হচ্ছে, তাদের ভবিষ্যৎও একই শঙ্কার মুখে পড়ছে। দেশের উচ্চশিক্ষায় নিয়োজিত মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৭২% এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশোনা করে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন কলেজের প্রাতিষ্ঠানিক ভর্তি ও ইনকোর্স পরীক্ষার ডেটাবেজ বিশ্লেষণ করে শিক্ষা গবেষকরা দেখিয়েছেন যে, ২০২৫ এবং ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রবণতায় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১৫% থেকে ২০% শিক্ষার্থী মাঝপথে অনার্স কমপ্লিট না করেই হারিয়ে যাচ্ছে।
অনার্স পাস করার পর বছরের পর বছর বেকার বসে থাকার চেয়ে অনার্স ২য় বা ৩য় বর্ষে উঠেই পড়াশোনা ছেড়ে দেওয়াকে শ্রেয় মনে করছে অনেক শিক্ষার্থী। চার বছরের কোর্স শেষ করতে সেশনজটের কারণে ৫ থেকে ৬ বছর লেগে যাওয়া এবং চাকরির বাজারের চাহিদার সাথে সিলেবাসের মিল না থাকায় উচ্চশিক্ষার প্রতি এক ধরণের চরম অনীহা ও হতাশা তৈরি হচ্ছে। ফলে নিশ্চিত বেকারত্বের দিকে না হেঁটে শিক্ষার্থীরা মাঝপথেই পড়াশোনা স্তব্ধ করে প্রবাসী শ্রমিক বা অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারে যোগ দিচ্ছে।
মূল কারণ: ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের অভাব
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এর শ্রমশক্তি জরিপ এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO)-এর মাঠ পর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের এই অস্বাভাবিক নিখোঁজ হয়ে যাওয়ার পেছনে কাজ করছে গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও অর্থনৈতিক কারণ:
১. শিক্ষিত বেকারত্বের উচ্চ হার: বিবিএস-এর বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে অশিক্ষিত মানুষের চেয়ে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার অনেক বেশি। এই বাস্তব চিত্র দেখে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিক উচ্চশিক্ষার উপযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
২. আর্থিক ব্যয় বনাম প্রাপ্তির অসমতা: চার-পাঁচ বছর ধরে লাখ লাখ টাকা খরচ করে অনার্স বা এইচএসসি শেষ করার পর যদি ৫-১০ হাজার টাকার চাকরিও না মেলে, তবে সেই শিক্ষার পেছনে ব্যয় করাকে অপচয় মনে করছে অভিভাবকরা।
৩. বাল্যবিবাহ ও সামাজিক অনিরাপত্তা: ইউনিসেফ (UNICEF) বাংলাদেশ ও শিক্ষা বোর্ডগুলোর যৌথ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মেয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে চাকরির বাজারের এই হতাশা দ্বিগুণ প্রভাব ফেলছে। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় অভিভাবকরা এইচএসসি কিংবা অনার্সের গণ্ডি পেরোনোর আগেই মেয়েদের বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের শঙ্কা ও পথ খোঁজা
শিক্ষাবিদ এবং জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির সংশ্লিষ্ট সদস্যরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীরা যদি উচ্চশিক্ষাকে বেকার তৈরির কারখানা মনে করে মাঝপথেই পড়ালেখা ছেড়ে দেয়, তবে দেশ এক বিশাল দক্ষ মানবসম্পদ সংকটে পড়বে। শুধুমাত্র কাগজের সার্টিফিকেটের পেছনে না ছুটে জরুরি ভিত্তিতে উচ্চশিক্ষাকে শতভাগ কর্মমুখী ও কারিগরি প্রযুক্তিনির্ভর করা না গেলে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে এই ঝরে পড়ার হার আগামীতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে, যা দেশের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকে পঙ্গু করে দিতে পারে।
সাকিব উল হক,
৪ জুলাই, ২০২৬