শিরোনামঃ

মহিষাসুর, সংগঠিত ন্যায়বোধ এবং উৎপাদন সংশ্লিষ্ট শ্রমজীবী মানুষ


মহিষাসুর হিন্দু পুরাণের একটি পরিচিত চরিত্র—এক শক্তিশালী অসুর, যিনি মহিষের রূপ ধারণ করতে পারতেন এবং ক্ষমতার জোরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত দেবী দুর্গার হাতে তাঁর পরাজয় ঘটে। এখানে মূলত: ‘মহিষাসুর’কে অন্যায় ক্ষমতা, শোষণ, আধিপত্য ও নিপীড়নের একটি প্রতীকী রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের ঘাম, শ্রম ও ত্যাগ। কৃষক মাঠে ফসল ফলান, শ্রমিক কারখানায় পণ্য উৎপাদন করেন, নির্মাণশ্রমিক ভবন-সেতু-সড়ক নির্মাণ করেন, পরিবহনশ্রমিক মানুষ ও পণ্য এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছে দেন। জেলে, দিনমজুর, গার্মেন্টসকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গৃহশ্রমিকসহ অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিনের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সমাজ ও অর্থনীতিকে সচল রাখেন। তাঁদের শ্রম ছাড়া মানুষের দৈনন্দিন জীবন, উৎপাদনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কার্যত অচল হয়ে পড়ত।

কিন্তু সমাজের উৎপাদন ও অর্থনীতিতে এত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেও বহু শ্রমজীবী মানুষ ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মক্ষেত্রে মর্যাদা, চিকিৎসা, সামাজিক নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত হন। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, অপ্রতুল মজুরি, কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনা, চাকরির অনিশ্চয়তা, শ্রমিকের সংগঠিত হওয়ার অধিকার সীমিত হওয়া এবং শ্রমের তুলনায় উৎপাদনের সুফলের অসম বণ্টন—এসব বাস্তবতা শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে কঠিন করে তোলে। বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক শ্রমিকদের ক্ষেত্রে জীবিকার অনিশ্চয়তা তাদের দর-কষাকষির ক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দিতে পারে।

এই প্রেক্ষাপটে ‘মহিষাসুর’কে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের প্রতীক না বানিয়ে শোষণমূলক ক্ষমতার একটি রূপক হিসেবে দেখা যেতে পারে। আর দুর্গার মহিষাসুরবধকে প্রতীকী অর্থে অন্যায়, নিপীড়ন ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত ন্যায়সংগ্রামের রূপ হিসেবে দেখা যেতে পারে।

শ্রমজীবী ও মেহনতি মানুষের জীবন, শ্রমের মর্যাদা, অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং শোষণ-নির্যাতনের বাস্তবতাকে মহিষাসুরের পৌরাণিক প্রতীকের আলোকে বিশ্লেষণ করা যেমন দরকার একই সঙ্গে এমন একটি সমাজের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা, যেখানে শ্রমের ন্যায্য মূল্য, শ্রমিকের অধিকার, নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে।

আজকের সমাজে ‘মহিষাসুর’কে আমরা ক্ষমতা, শোষণ, আধিপত্য এবং মানুষের শ্রমের ওপর অন্যায়ভাবে নিয়ন্ত্রণকে বুঝি। সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো শ্রম। কৃষক জমিতে ফসল ফলান, শ্রমিক কারখানায় উৎপাদন করেন, নির্মাণশ্রমিক ভবন ও সড়ক নির্মাণ করেন, পরিবহনশ্রমিক মানুষ ও পণ্য বহন করেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী শহরকে বাসযোগ্য রাখেন। অসংখ্য শ্রমজীবী মানুষ প্রতিদিনের শ্রমের মাধ্যমে সমাজের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে সচল রাখেন।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—যাঁরা এত কিছু উৎপাদন করেন, তাঁদের জীবনে সেই উৎপাদনের সুফল কতটা পৌঁছায়? যখন কোনো শ্রমিক দীর্ঘ সময় কাজ করেও ন্যায্য মজুরি পান না, যখন কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না, যখন শ্রমিকের অসুস্থতা, বার্ধক্য বা দুর্ঘটনার ঝুঁকির যথাযথ সুরক্ষা থাকে না কিংবা যখন সংগঠিত হওয়ার অধিকার বাধাগ্রস্ত হয়—তখন সেখানে শ্রম ও ক্ষমতার অসম সম্পর্ক তৈরি হয়। এই অসমতাকেই আমরা ‘মহিষাসুরের রূপক’ হিসেবে বর্ণনা করি।

পুরাণে বর্ণিত মহিষাসুরের শক্তি ছিল তার ক্ষমতা ও আধিপত্যে। আধুনিক সমাজের শোষণও অনেক সময় সরাসরি শারীরিক শক্তির মাধ্যমে ঘটে না। অর্থনৈতিক ক্ষমতা, সম্পদের কেন্দ্রীভবন, কর্মসংস্থানের ওপর নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল শ্রমবাজার, বৈষম্যমূলক কাঠামো কিংবা শ্রমিকের দর-কষাকষির ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার মাধ্যমে শোষণ তৈরি হতে পারে।

এই কারণেই শ্রমিকের সংগ্রাম কেবল বেশি মজুরির দাবি নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, কর্মঘণ্টার ন্যায্যতা, সামাজিক নিরাপত্তা, চিকিৎসা, ছুটি, পেনশন, সংগঠিত হওয়ার অধিকার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার।

দুর্গার হাতে মহিষাসুরের পতনকে একটি মানবিক ও সামাজিক প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। অন্যায় যত শক্তিশালীই হোক, সংগঠিত ন্যায়বোধ ও মানুষের সম্মিলিত শক্তির কাছে তার জবাবদিহি থাকা দরকার। আজকের শ্রমজীবী মানুষের সংগ্রাম কোনো নির্দিষ্ট শ্রেণি বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানোর সংগ্রাম হওয়া উচিত নয়। বরং এটি হওয়া উচিত এমন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, যেখানে শ্রমের মর্যাদা থাকবে, উৎপাদনের সুফল ন্যায্যভাবে বণ্টিত হবে এবং শ্রমিক মানুষকে কেবল উৎপাদনের উপকরণ হিসেবে নয়, একজন পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে।


apurbagautam@gmail.com

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?