সকল সুবিধা থেকে বঞ্চিত বরিশালের তৃতীয়  লিঙ্গের মানুষরা, ঈদেরও ছিল না উৎসবের আমেজ

ঈদুল ফিতরকে ঘিরে সারা দেশে উৎসবের আমেজ ছিল, নতুন পোশাক আর আনন্দে মুখরিত চারপাশ, আর বরিশালে প্রায় শতাধিক তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ রয়েছিলেন চরম অবহেলা ও বঞ্চনার মধ্যে। জীবনের তাগিদে ভিক্ষাবৃত্তি ও অনিয়মিত আয়ের ওপর নির্ভরশীল এই জনগোষ্ঠীর কাছে এবার ঈদ ছিল যেন নিছকই আরেকটি সাধারণ দিন।

নগরীর কীর্তনখোলা নদীর তীরবর্তী রসুলপুর কলোনির সরকারি খাস জমিতে কয়েক যুগ ধরে বসবাস করে আসছেন তারা। দলনেতা কবরী হিজড়ার নেতৃত্বে বিভিন্ন বিয়ে বাড়ি, নবজাতকের আগমন কিংবা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে নাচ-গান করে জীবিকা নির্বাহ করলেও সাম্প্রতিক নানা সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাদের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা জানান, এবারের ঈদে নতুন কাপড় তো দূরের কথা, অনেকের ঘরে সেমাই রান্নার সামর্থ্যও হয়নি তাদের। বিগত বছরগুলোতে সরকারি বা বেসরকারি কিছু সহায়তা পেলেও এবার তাদের খোঁজ নেয়নি কোনো রাজনৈতিক দল বা প্রশাসন। সোহাগী হিজড়া বলেন, হিজড়া পরিচয়ের কারণে পরিবার থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে আছি। বাসা ভাড়া নিতে গেলেও মালিকরা তাড়িয়ে দেন। তাই বাধ্য হয়ে বস্তিতেই থাকতে হচ্ছে।

সালমা হিজড়া বলেন, সরকার যদি আমাদের জন্য থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে, তাহলে আমরা কারও কাছে হাত না পেতে কাজ করে খেতে পারবো। তিশা হিজড়া জানান, মানুষের বাড়িতে নাচ-গান করে বা হাট-বাজার থেকে যা পাই, তাতে দিনে ১০০ থেকে ২০০ টাকা আয় হয়। অনেক দিন সেটাও হয় না। এখন আর জোর করে টাকা তুলি না, তাই কষ্ট আরও বেড়েছে।

গুরুমাতা কবরী হিজড়া বলেন, তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি পেয়েছি, কিন্তু বাস্তবে কোনো সুযোগ-সুবিধা পাইনি। জেলা প্রশাসকরা আশ্বাস দেন, কিন্তু বাস্তবায়ন হয় না। আমরা শিক্ষা, চাকরি ও কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ চাই।

এ বিষয়ে বরিশাল জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক একেএম আখতারুজ্জামান তালুকদার জানান, সরকারি ভাতার আওতায় কিছু হিজড়াকে আনা হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও সহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

সমাজসেবা অফিসার জাবির আহমেদ বলেন, হিজড়া সম্প্রদায়ের উন্নয়নে দর্জি, কম্পিউটার ও পার্লার বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৪৭ জনকে ৩ মাস অন্তর ৬০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। তবে ঈদের আগে বরাদ্ধ না থাকায় তাদের সহায়তা প্রদান করা যায়নি। 

অন্যদিকে বরিশাল জেলা প্রশাসক মো. খাইরুল আলম সুমন জানান, হিজড়াদের পুনর্বাসনে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। আবাসন ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে কাজ চলছে। ঈদে তারা কষ্টে আছে শুনেই তাদের ১০ কেজি করে চাল দেয়া হয়েছে। 


উল্লেখ্য, দেশে বৈষম্য দূর করে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার ২০১৩ সালের নভেম্বরে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি দেয় এবং ২০১৪ সালের ২৬ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করা হয়। এরপরও বরিশালে এই সম্প্রদায়ের জন্য স্থায়ী আবাসন ব্যবস্থা না হওয়ায় তারা এখনও রসুলপুর কলোনিসহ বিভিন্ন বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তৃতীয় লিঙ্গের এই জনগোষ্ঠীকে মূলধারায় আনতে শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, সমাজের বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসা জরুরি। তাদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।


এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?