নেতাকর্মী নয়, জনসম্পৃক্ত আন্দোলনই ক্ষমতার চাবিকাঠি: বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন শিক্ষা
আরিফ রহমান
২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি বিশেষ বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে। এ সময়ে একদিকে ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কার্যকর রাজনৈতিক কৌশল ও জনসম্পৃক্ত আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে নানা সীমাবদ্ধতার পরিচয় দিয়েছে। এর ফলে দীর্ঘ সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের একচ্ছত্র প্রভাব বজায় ছিল।
দীর্ঘ এই সময়ে বিএনপি জনগণের মৌলিক সমস্যা ও প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে কার্যকর, বিস্তৃত ও টেকসই গণ-আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি। দলটির আন্দোলন অনেক ক্ষেত্রে নেতাকর্মীকেন্দ্রিক কর্মসূচি, রাজপথে শক্তি প্রদর্শন এবং ক্ষমতার পালাবদলের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থেকেছে। ফলে আন্দোলনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক সম্পৃক্ততা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সরকার রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে এসব কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ বা দমন করতে সক্ষম হয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ওঠা বিতর্ক এবং বিরোধী দলের কার্যকর রাজনৈতিক চাপ তৈরির সীমাবদ্ধতা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপটে ঘটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই গণ-আন্দোলন ক্রমে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পেশাজীবীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণে ব্যাপক গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ, অর্থনৈতিক চাপ, নাগরিক অধিকারসংক্রান্ত উদ্বেগ এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভ এ আন্দোলনকে আরও বিস্তৃত করে। এর পরিণতিতে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশত্যাগ করেন।
এই গণ-অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব কোনো একক রাজনৈতিক দলকে দেওয়া যথার্থ হবে না। বরং এটি ছিল বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ, দীর্ঘদিনের অসন্তোষ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার বহিঃপ্রকাশ। আন্দোলনের মূল শক্তি ছিল এর ব্যাপক জনসম্পৃক্ততা। দলীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই আন্দোলনটিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যেখানে প্রচলিত রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ আমূল বদলে যায়।
গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে একটি সুবিধাজনক অবস্থানে আসে। দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম প্রধান দাবিদার হিসেবে আবির্ভূত হয়। তবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দলটির ভবিষ্যৎ ভূমিকার ওপরই নির্ভর করবে এই রাজনৈতিক সুবিধা কতটা টেকসই হয়।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনৈতিক কৌশল বিশ্লেষণ করতে গিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে: দলটি কি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিচ্ছে? জনগণের বৃহত্তর অংশকে সম্পৃক্ত করে আন্দোলন গড়ে তোলার পরিবর্তে যদি দলীয় নেতাকর্মীদের উপস্থিতি ও রাজপথে শক্তি প্রদর্শনকেই রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পাওয়ার প্রধান উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে তা হবে একটি কৌশলগত সীমাবদ্ধতা। কারণ, শুধু দলীয় কর্মীদের সক্রিয়তা দিয়ে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আস্থা পুনরুদ্ধার করা সম্ভব নয়।
রাজনীতির ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, জনসমর্থন ছাড়া কেবল সাংগঠনিক শক্তি প্রদর্শন দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে না। জনগণের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বেকারত্ব, কর্মসংস্থানের অভাব, নাগরিক অধিকার এবং সুশাসনের প্রশ্নে কোনো রাজনৈতিক দলের সুস্পষ্ট অবস্থান ও কার্যকর কর্মসূচি না থাকলে সেই দলের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব বাড়তে পারে। আওয়ামী লীগ যদি এসব প্রশ্নে জনগণের আস্থা অর্জনের পরিবর্তে শুধু দলীয় শক্তি প্রদর্শনের ওপর নির্ভর করে, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে সুবিধা পেতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনা নির্ভর করবে বিএনপি নিজেও কতটা জনসম্পৃক্ত, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করতে পারে তার ওপর।
এখানেই বাংলাদেশের রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিহিত রয়েছে। রাজপথে জনসমাগম ঘটানো এবং প্রকৃত অর্থে জনসম্পৃক্ত আন্দোলন গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। প্রথমটি দলীয় সাংগঠনিক শক্তির বহিঃপ্রকাশ হতে পারে; দ্বিতীয়টি জনগণের বাস্তব সমস্যা, আকাঙ্ক্ষা ও অধিকারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা সম্মিলিত রাজনৈতিক উদ্যোগ। যে আন্দোলনের সঙ্গে মানুষের জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার সংযোগ থাকে, সেই আন্দোলনই দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
রাজনীতিবিদদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন, জনগণকে উপেক্ষা করে কেবল দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্ভর করে টেকসই রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা যায় না। রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা অর্জন, জনসমর্থন বৃদ্ধি এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে জনসম্পৃক্ত আন্দোলন ও জনগণের আস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নাগরিক অধিকার ও সুশাসনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোকে রাজনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে আনতে হবে। একই সঙ্গে জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে শান্তিপূর্ণ, গণতান্ত্রিক ও জবাবদিহিমূলক আন্দোলনের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে: রাজনীতির প্রকৃত শক্তি শুধু দলীয় কার্যালয়ে, সাংগঠনিক কাঠামোয় কিংবা রাজপথে নেতাকর্মীদের উপস্থিতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রকৃত ভিত্তি জনগণের আস্থা ও সক্রিয় অংশগ্রহণ। যে রাজনৈতিক দল এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারবে, তাদের সমস্যা ও প্রত্যাশাকে ধারণ করতে পারবে এবং বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ দেখাতে পারবে, ভবিষ্যতের রাজনীতিতে তারাই এগিয়ে থাকার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে টেকসই সাফল্যের চাবিকাঠি তাই শুধু নেতাকর্মী নয়, বরং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে চলা।আরিফ রহমান - লেখক ও গবেষক, আজীবন সদস্য, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউট ও যুগ্ন সম্পাদক বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম। ০১৭১১৭৮৩৬৭৮