শিরোনামঃ

গণতন্ত্রের মোড়কে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ: ভেনেজুয়েলা ও বৈশ্বিক সার্বভৌমত্বের সংকট




​📕 বাহাউদ্দিন গোলাপ 


📌 আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র যখন কোনো ধূলিকণার প্রশংসা করে, তখন সেই প্রশংসার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক গভীর রাজনৈতিক অভিসন্ধি। ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংকটে বিরোধী নেত্রী মারিয়া করিনা মাচাদো যখন ডোনাল্ড ট্রাম্পকে 'নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য' বলে অভিহিত করেন, তখন তা কেবল একটি ব্যক্তিগত অভিবাদন থাকে না; বরং তা হয়ে ওঠে ল্যাটিন আমেরিকার ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন আধিপত্যের এক নগ্ন প্রতিফলন। মাচাদোর এই চাটুকারিতা মূলত ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্বের ওপর মার্কিন ‘মনরো ডকট্রিন’-এর সেই পুরনো আধিপত্যকেই নতুন করে বৈধতা দিচ্ছে। এই ডকট্রিন মূলত পুরো আমেরিকা মহাদেশকে ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র প্রভাব বলয়ে রাখার একটি ঐতিহাসিক ও অলিখিত ইশতেহার, যা আজও অঞ্চলের দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।


​ওয়াশিংটন কয়েক দশক ধরে দাবি করে আসছে যে, তাদের নিষেধাজ্ঞা কেবল ভেনেজুয়েলার স্বৈরশাসনকে লক্ষ্য করে। তবে বাস্তবতার চিত্রটি ভিন্ন। সেন্টার ফর ইকোনমিক অ্যান্ড পলিসি রিসার্চ (CEPR)-এর পরিসংখ্যান এক ভয়াবহ সত্য উন্মোচন করে: ২০১৭ সাল থেকে আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার ফলে দেশটিতে ঔষধ ও খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হাজার হাজার মানুষের অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একে ‘মানবিক হস্তক্ষেপ’ বলা হলেও মূলত এটি একটি জাতির বিরুদ্ধে পরিচালিত সর্বাত্মক অর্থনৈতিক যুদ্ধ। যেখানে বোমা বর্ষণ ছাড়াই একটি জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও খাদ্য নিরাপত্তাকে ধ্বংস করা হয়, সেখানে একে ‘গণতন্ত্রের প্রচার’ নয় বরং ‘কাঠামোগত সহিংসতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করাই সংগত। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, কোনো সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক লক্ষ্যের জন্য একটি জনগোষ্ঠীর ওপর এ ধরণের সামষ্টিক শাস্তি (Collective punishment) চাপিয়ে দেওয়া মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন।


​ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ সবসময়ই তাদের স্বার্থ রক্ষায় ‘গণতন্ত্র’ ও ‘শান্তি’ শব্দগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছে। ১৯৮৯ সালে পানামা আক্রমণ ছিল এর এক ধ্রুপদী উদাহরণ, যেখানে নিজেদের অনুগত প্রশাসন বসানো হয়েছিল কেবল কৌশলগত পানামা খালের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে। ২০০৩ সালে ‘গণবিধ্বংসী অস্ত্রের’ মিথ্যা ও বানোয়াট অজুহাতে ইরাক আক্রমণ মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য চিরতরে নষ্ট করে দিয়েছে। সাদ্দাম হোসেনের পতনের চেয়েও ওয়াশিংটনের মূল লক্ষ্য ছিল ইরাকের বিশাল তেল মজুতের ওপর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা, যার খেসারত আজ একটি জনপদ ধ্বংসস্তূপের নিচে দিচ্ছে। একইভাবে, ২০ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের পর আফগানিস্তানকে এক চরম অনিশ্চয়তা ও দারিদ্র্যের মুখে ফেলে মার্কিন প্রস্থান প্রমাণ করে যে, তাদের ‘নেশন বিল্ডিং’ বা রাষ্ট্র গঠনের তত্ত্ব ছিল আসলে মধ্য এশিয়ায় সামরিক ও কৌশলগত ঘাঁটি গেড়ে বসার এক বিশাল ভাঁওতাবাজি।


​২০১১ সালে লিবিয়ায় ন্যাটো ও মার্কিন হস্তক্ষেপ দেশটিকে এক সমৃদ্ধ রাষ্ট্র থেকে বর্তমানের এক নৈরাজ্যকর ভূখণ্ডে পরিণত করেছে, যেখানে তেল সম্পদ এখন কেবল বিদেশি শক্তির চারণভূমি। এই আধিপত্যবাদী নীতি একটি বৈশ্বিক 'প্যাটার্ন' বা ছক। কিউবা কয়েক দশক ধরে এক অমানবিক ও একপাক্ষিক অর্থনৈতিক অবরোধের শিকার। ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো মূলত মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও ইসরায়েলি আধিপত্য নিরঙ্কুশ করার একটি হাতিয়ার। একইভাবে, চিলিতে নির্বাচিত সরকারের পতন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে বলিভিয়ার লিথিয়াম খনি নিয়ন্ত্রণ বা সিরিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ দখলের লড়াই—প্রতিটি ঘটনাই প্রমাণ করে যে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি মূলত খনিজ সম্পদ এবং ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এটি একটি নব্য-উপনিবেশবাদ, যেখানে কর্পোরেট স্বার্থই রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ করে।


​ভেনেজুয়েলার এই সংকট আজ আর কেবল একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নয়, বরং এটি বৈশ্বিক দক্ষিণ (Global South)-এর ছোট দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব রক্ষার এক মরণপণ সংগ্রামের প্রতীক। যখন কোনো পরাশক্তি তাদের বাণিজ্যিক ও সামরিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে একটি স্বাধীন জাতির ওপর অর্থনৈতিক শ্বাসরোধকারী নীতি চাপিয়ে দেয়, তখন তা বিশ্ব-ব্যবস্থার সেই চরম অসাম্যকেই ফুটিয়ে তোলে যেখানে শক্তিই ন্যায়বিচারের মাপকাঠি হয়ে দাঁড়ায়। ভেনেজুয়েলা আজ সেই সব মুক্তিকামী মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছে, যারা সাম্রাজ্যবাদী ছায়ার নিচে বাস করেও নিজের মাটির ওপর নিজের অধিকার রক্ষায় আপসহীন।


​কোনো স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ক্ষমতার মোহে ভিনদেশী আগ্রাসনকে নৈতিক সমর্থন দেয়, তখন সেই রাজনীতির নৈতিক ভিত্তি চরমভাবে নড়বড়ে হয়ে পড়ে। মাচাদোর এই চাটুকারিতা ভেনেজুয়েলার সাধারণ মানুষের অধিকারের চেয়ে মার্কিন করপোরেট ও সামরিক শিল্পগোষ্ঠীর স্বার্থকেই বেশি ত্বরান্বিত করে। ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দ্বন্দ্বকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ওয়াশিংটন ল্যাটিন আমেরিকায় তাদের একমেরু বিশ্বের আধিপত্য টিকিয়ে রাখতে চাইছে। এটি কোনো নিছক আদর্শিক লড়াই নয়, বরং একুশ শতকের এক আধুনিক ও পরিশীলিত নিও-কলোনিয়ালিজম, যেখানে ব্যালটের চেয়ে ডলার ও নিষেধাজ্ঞার জোরই বেশি কার্যকর।


​ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের সার্বভৌম অধিকার কেবল এবং কেবলমাত্র দেশটির সাধারণ মানুষের। নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে একটি জাতিকে ক্ষুধার্ত রেখে এবং মানবিক সহায়তার মোড়কে আগ্রাসনের ভয় দেখিয়ে শান্তির কথা বলা এক ধরণের চরম রাজনৈতিক ও নৈতিক ভণ্ডামি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আজ এই রূঢ় সত্য উপলব্ধি করতে হবে যে, পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কখনোই স্বাধীনতার প্রকৃত বিকল্প হতে পারে না। ভেনেজুয়েলার সংকট নিরসনে প্রয়োজন বিদেশি হস্তক্ষেপমুক্ত এক স্বচ্ছ ও স্বাধীন গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যেখানে জনগণের ইচ্ছা কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে জিম্মি থাকবে না। মার্কিন নীতির এই দীর্ঘ ছায়া যতদিন বিশ্বজুড়ে বিস্তৃত থাকবে, ততদিন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা কেবল একটি মরীচিকা হয়েই থাকবে।


বাহাউদ্দিন গোলাপ

(ডেপুটি রেজিস্ট্রার, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়, b_golap@yahoo.com, 01712070133)

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?