শিরোনামঃ

বরগুনায় ৩ দিন পর খালিদের মরদেহ নিশ্চিত করলো ডিএনএ রিপোর্ট: দোষীদের বিচারের দাবি স্বজনদের


সোহাগ হাওলাদার,বরগুনাঃ

রাজধানীর মিরপুরের শিয়ালবাড়িতে পোশাক কারখানা ও রাসায়নিক গুদামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের তিন দিন পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শনাক্ত হলো বরগুনার যুবক খালিদ হাসান সাব্বির (২৯)-এর মরদেহ। জীবনযুদ্ধে নামার মাত্র দেড় মাসের মাথায় অকালে ঝরে গেলেন সদা হাস্যোজ্জ্বল, সমাজসেবী এই তরুণ।

​স্বজনদের আকুতি ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে 

সোমবার (২০ অক্টোবর) সকাল ৫টায় খালিদের মরদেহ বরগুনা নিয়ে আসা হয়। তাঁর মরদেহ শনাক্ত হওয়ায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে বরগুনা সদর উপজেলার ৭ নং ঢলুয়া ইউনিয়নের ইসলামপুর বান্দরগাছিয়া গ্রামে। খালিদ পোশাক কারখানায় চাকরি করতেন এবং জীবনধারণের তাগিদেই মাসখানেক আগে বরগুনা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন।

​মৃত্যুর আগে জীবনের এমন মর্মান্তিক পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না খালিদের বাবা মনিরুল ইসলাম জোনাদ্দার। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একজন অবসরপ্রাপ্ত সার্জেন্ট। দেশের সেবায় জীবন পার করলেও, সন্তানের এমন অসহায় মৃত্যু তাঁকে ভেঙে দিয়েছে। 


​অগ্নিকাণ্ডের পর থেকেই মনিরুল ইসলাম জোনাদ্দার সন্তানের খোঁজে ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে, ফায়ার সার্ভিস কার্যালয়ে এবং রূপনগর থানা এলাকায় পাগলের মতো ঘুরেছেন। একজন শৃঙ্খলাবদ্ধ মানুষ হয়েও সন্তানের জন্য তাঁর তিন দিনের এই দৌড়াদৌড়ি ও আকুতি উপস্থিত সবার চোখ ভিজিয়েছে। নিহতের বাবা অশ্রুসিক্ত নয়নে সাংবাদিকদের জানান, "আমার একমাত্র ছেলে আমাকে আর কেউ বাবা বলে ডাকবে না। আমার ছেলেটা মাত্র মাসখানেক আগে বরগুনা থেকে ঢাকায় এলো। মঙ্গলবার রাতে আগুন লাগার খবর শোনার পর থেকে আমার চোখে আর ঘুম নেই। হাসপাতালের মর্গে গিয়ে দেখি মরদেহগুলো এতটাই বিকৃত যে, নিজের সন্তানকেও চেনার উপায় নেই। শুধু ডিএনএ পরীক্ষার ভরসায় ছিলাম। এমন মৃত্যু যেন আর কারো ভাগ্যে না জোটে।" 


​খালিদের স্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, "ওই দিন আমার সাথে তেমন কোনো কথা না হলেও মেসেজে দুই একবার 'হায় হ্যালো' হয়। দুপুরের দিকে আমাদের পরিচিত এক লোক ফোন করে জানান খালিদের পাশের ভবনে আগুন লেগেছে। তার পর থেকে ফোন দিলে খালিদকে আর পাওয়া যায় না। তারপরেই  আমরা সাথে সাথে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেই।"

​শোকের মাঝে খালিদের ফুপা সাংবাদিকদের বলেন, "খালিদ যে অফিসে চাকরি করত, আগুন লাগার ওই মুহূর্তে সে তিন তলায় ছিল। আগুন লাগার খবর পেয়ে  নিচে আসলেও সে বের হতে পারেনি। কারণ মেইন দরজায় তালা লাগানো ছিল।" তিনি আরও দাবি করে বলেন, "আমাদের দাবি, কে বা কারা তালা লাগালো তা তদন্ত করে বিচারের আওতায় আনা হোক। যারা এভাবে তালা দিয়ে কর্মীদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিল, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।"

​স্বজনদের অপেক্ষার পালা শেষে আজ সোমবার, (২০ অক্টোবর) সকাল ৫ টার সময় খালিদ হাসান সাব্বিরের মরদেহ তাঁর নিজ বাড়িতে নিয়ে আসা হয়। সকাল ১১ টার সময় মাদ্রাসা মাঠে  স জানাজা নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়। এই অকালমৃত্যুতে এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোক।

​মাত্র ২৯ বছর বয়সী খালিদ তাঁর এলাকায় ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। বরগুনায় তিনি শিশু কিশোর সংগঠন 'খেলাঘর'-এর একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন। পাশাপাশি, তিনি 'বিডিক্লিন বরগুনা জেলা'-এর একজন নিবেদিতপ্রাণ সদস্য হিসেবে শহরকে পরিচ্ছন্ন রাখা ও জনসচেতনতামূলক অসংখ্য সামাজিক কাজে নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। এলাকার মানুষ তাঁকে একজন সংস্কৃতিমনা, মিশুক এবং সমাজসেবী হিসেবে জানতেন। তাঁর অকালমৃত্যু স্থানীয় সামাজিক সংগঠনগুলোতে এক গভীর শূন্যতা সৃষ্টি করল। 


​খালিদের সাংগঠনিক বড় ভাই সুদেব বিশ্বাস শোকাহত কণ্ঠে বলেন, "খালিদ তোরে পাঁজরের মধ্যে রাখতে পারলে হয়তো তোর কোমলতার অবলুপ্তি হতো না। এতটা অসহায় নিজেকে আর কখনো মনে হয়নি। আমি ওর জন্য সবার কাছে দোয়া চাই।"

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?