মাহরীন চৌধুরী: অগ্নিপথে ছড়ালেন যিনি মমতার ফুল


📌২১ জুলাই ২০২৫, সোমবার। দিয়াবাড়ির আকাশ সেদিন শুধু রোদ্দুর নিয়ে আসেনি, এনেছিল শোকের ঘন মেঘ। দুপুর ১টা ১৮ মিনিটে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি F-7 BGI প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ঢাকার উত্তরার ‘মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ ভবনে আছড়ে পড়ে। মুহূর্তেই বিস্ফোরণ, আগুন, আতঙ্ক আর আর্তনাদে স্তব্ধ হয়ে যায় চারদিক। ধোঁয়ায় ঢেকে যায় স্বপ্ন, আগুনে পুড়ে ভস্ম হয় অজস্র জীবন-প্রবাহ।


সেই মৃত্যুযজ্ঞের মাঝেও একজন দাঁড়িয়ে ছিলেন বুক পেতে—মাইলস্টোন স্কুলের সম্মানিত শিক্ষিকা মাহরীন চৌধুরী। তাঁর চিরচেনা শীতল হাসির আড়ালে যে এমন অগ্নিপরীক্ষার সাহস লুকিয়ে ছিল, তা কে জানত? বিমানটি ভবনের উপর আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে যেভাবে তিনি শিক্ষার্থীদের দিক ছুটে যান, জ্বলন্ত ছাদ আর দেয়ালের নিচে থেকেও চেষ্টা করেন বাচ্চাদের নিরাপদ স্থানে নিতে—তা যেন শুধু শিক্ষকসুলভ দায়বদ্ধতা নয়, এক অমোঘ মানবিকতার জলছবি।


প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠে আসে, তিনি পেছনের ক্লাসঘরগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের দ্রুত নামাতে থাকেন। একজন শিক্ষার্থীকে ধাক্কা দিয়ে তিনি নিজে তার আগুনঘেরা পথে দাঁড়িয়ে পড়েন। আগুনের মধ্যে আটকে পড়া এক শিশুকে কোলে তুলে দৌড়ানোর কিছুক্ষণ পরই আরেকটি বিস্ফোরণে তিনি গুরুতর দগ্ধ হন। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।


একজন নারী, একজন শিক্ষিকা, একজন মানুষ—কোনো বিশেষণই যথেষ্ট নয় মাহরীন চৌধুরীর এই আত্মত্যাগের ব্যাখ্যা দিতে। তাঁর মৃত্যু মৃত্যু নয়, তা যেন এক জীবনদান। এক শিক্ষক, যিনি নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করলেন তাঁর শিক্ষার্থীদের জীবন—তাঁর মতো মানুষ ইতিহাসে স্থান করে নেন হৃদয়ের অক্ষরে, পাথরের নয়।


আমরা যখন বলি, শিক্ষক হচ্ছেন জাতির প্রকৃত কারিগর, তখন মাহরীন চৌধুরীর মতো মানুষদের কথা বলতে হয়। তাঁর এই সাহস, এই দায়বদ্ধতা, এই ভালোবাসা আমাদের শিক্ষা দেয়—মানুষের ভেতর এখনো আলোর আশ্রয় আছে, এখনো পৃথিবীর অন্ধকারে কেউ কেউ দীপ জ্বালায়।


তারপরও প্রশ্ন রয়ে যায়—এমন দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আমাদের প্রস্তুতি কী? কেন জনবহুল আবাসিক এলাকায় প্রশিক্ষণ বিমান ওড়ানো হবে? কেন স্কুলের পাশেই এমন উচ্চঝুঁকির কর্মযজ্ঞ চলবে? এবং সর্বোপরি, কেন এখনো নিরাপত্তা প্রটোকলগুলো শিশুর চোখে ধোঁয়া হয়ে নেমে আসে?


মাহরীন চৌধুরীর এই আত্মদান যেন শুধু শ্রদ্ধার পুষ্প নয়, হোক আমাদের জন্য এক কঠিন বার্তা। প্রতিটি বিদ্যালয়ের আঙিনা নিরাপদ হোক, প্রতিটি শিশুর স্কুলগামী সকাল হোক আনন্দে ভরা, প্রতিটি শিক্ষক যেন আত্মত্যাগে নয়, জীবিত থেকেই হোন শ্রদ্ধায় পূর্ণ।


আমরা মাহরীন চৌধুরীর বিদেহী আত্মার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। তাঁর ত্যাগের মহিমা যেন অদৃশ্য ব্যানারে লেখা থাকে প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে। আহত ছাত্রছাত্রীদের জন্য প্রার্থনা করি দ্রুত আরোগ্য, এবং চাই—আর কোনো শিক্ষককে যেন এভাবে জীবন দিতে না হয়, যেন ভবিষ্যতের পথে এমন শোক আর না নামে।


এই আকাশ, এই শহর, এই জাতি—তাঁকে মনে রাখবে অনন্তকাল।


◼️ 

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?