জনসংখ্যা দায় নয়,সম্পদ               -আফরোজা নাইচ রিমা



বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ন্যায় বাংলাদেশও আয়তনের তুলনায় অধিক জনসংখ্যাকে মানব সম্পদে রূপান্তর করতে বদ্ধপরিকর। ইতোমধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণে জোর দেয়া হচ্ছে। শিক্ষিত ও অল্প শিক্ষিত যুবকদের প্রশিক্ষণ প্রদান, ঋণ প্রদান ও বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে সহায়তা করা হচ্ছে। সরকারের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধি পেলে বাংলাদেশের জনসংখ্যা মানব সম্পদে পরিণত হবে। একটি দেশের জনগণ তথা সাধারণ মানুষ দেশটির প্রধান শক্তি। যদি সাধারণ মানুষ খাদ্যে-স্বাস্থ্যে-শিক্ষায় সবল ও কর্মক্ষম থাকে, তবেই  সমৃদ্ধ একটি দেশ নির্মাণ  সম্ভবপর।  তাহলে আমাদের জনসংখ্যা দায় নয় ,সম্পদে পরিণত হবে ।


বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, জনসংখ্যা বাড়া-কমার গুরুত্বপূর্ণ সূচক টোটাল ফার্টিলিটি রেট বা টিএফআর। এভাবে বলা যায় , একজন নারী তার সমগ্র জীবনে গড়ে যতজন সন্তানের জন্ম দেন, তার হিসাবই হচ্ছে টিএফআর। ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোতে জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার কম। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশে জন্মহার কম এবং মৃত্যুর হার বেশি। ইউরোপিয়ান কমিশনের রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপের জনসংখ্যা ৫০ মিলিয়ন হ্রাস পেতে পারে। জার্মানির (টিএফআর) জন্মহার প্রতি মহিলার জন্য ১ দশমিক ৫ শিশু, যা জনসংখ্যার প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতার জন্য পর্যাপ্ত নয়। 


ইউরোপের দেশেগুলোতে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে বয়স্ক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইউরোপিয়ান কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে ইউরোপের জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বয়স্ক নাগরিক হবে, যা বর্তমানে প্রায় ২০ শতাংশ। আদমশুমারি ২০২২ অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৬.৯৮ কোটি। বাংলাদেশের জনসংখ্যা ও জনবিন্যাসের কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। সাধারণত টিএফআর-এর মান ২ দশমিক শূন্য কিংবা তার নিচে হলে সেটি ‘প্রতিস্থাপনযোগ্য হার’ হিসেবে বিবেচিত হয়।


  জানা যায়, বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৯টি দেশে: ভারত, নাইজেরিয়া, কঙ্গো, পাকিস্তান, ইথিওপিয়া, তানজানিয়া, আমেরিকা, উগান্ডা, ইন্দোনেশিয়া। পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে যেখানে প্রতি মিনিটে ২৫০ শিশুর জন্ম হয়। বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে ১০টি শিশু।


বাংলাদেশে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে জনশক্তিকে আরও দক্ষ করতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে তরুণ যুব বেকারদের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করে তাদের কাজে লাগাতে হবে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের সিংহভাগ অঞ্চলের মাটিই উর্বর ও আবাদযোগ্য। তাই আমাদের কৃষিক্ষেত্রে দক্ষ জনশক্তির মাধ্যমে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারলে উৎপাদন বৃদ্ধি করা আমাদের জন্য সহজ। কৃষি, খাদ্য এবং জন্মনিরোধে বাংলাদেশের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। কৃষিকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি বলা হচ্ছে।



এ মুহূর্তে বাংলাদেশে ১৫ বছর থেকে ৬০ বছর বয়সের মানুষ বেশি, যারা কর্মক্ষম। দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে চাষাবাদ, প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে। শুধু তাই নয় জনশক্তি রপ্তানির প্রক্রিয়া সহজীকরণসহ সহজশর্তে ঋণের মাধ্যমে জাতীয় উন্নয়নে অংশগ্রহণের সুযোগ করে দিতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবা খাতে বিনিয়োগ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের মাধ্যমে দেশের জনসংখ্যা নিয়ে আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং উদ্যোগ একটি উন্নত, সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। দেশের জনসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশই কর্মক্ষম, যা সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনায় দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদে পরিণত হতে পারে। এজন্য বিকেন্দ্রীকরণ এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে উন্নয়ন নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই।


বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি মূলত অশিক্ষা, দারিদ্র্য, কুসংস্কার, ধর্মীয় ভ্রান্ত ধারণা ও সচেতনতার অভাবের কারণে ঘটছে। কিন্তু বর্তমানে জনশসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তাই জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণ, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বিবাহযোগ্য বয়স বৃদ্ধি এবং ছোট পরিবার গঠনের প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করা হচ্ছে।


জাতিসংঘের তথ্যমতে, বর্তমানে পৃথিবীতে জনসংখ্যা প্রায় ৮০০ কোটির মতো। ধারণা করা হচ্ছে ২০৩০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১০০০ কোটিতে পৌঁছাবে। অথচ ১৮০৪ সালে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০০ কোটি এবং তা দ্বিগুণ হতে সময় লেগেছিল ১২৩ বছর। এখন প্রতি ১০ থেকে ১৫ বছরেই যুক্ত হচ্ছে ১০০ কোটি মানুষ। ২০৫০ সালের মধ্যে যেসব দেশে জনসংখ্যা সবচেয়ে বেশি বাড়বে, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জনসংখ্যা বৃদ্ধির প্রভাব কেবল পরিবেশ বা অর্থনীতিতে সীমাবদ্ধ নয়, সামাজিক কাঠামোতেও তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। নগরায়ণ বাড়লেও অপরিকল্পিত শহর ব্যবস্থাপনা এবং গ্রামীণ জীবনের সুযোগ-সুবিধার অভাব একটি অসম সমাজ তৈরি করছে। এ কারণে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থান ক্ষেত্রে ব্যাপক বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে।


তবে হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ম্যালথাসীয় জনসংখ্যা তত্ত্ব আমাদের সতর্ক করে দিলেও, তার বিপরীতে রয়েছে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ তত্ত্ব। এটি বলছে যদি কোনো দেশে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত বেশি থাকে এবং তাদের জন্য উপযুক্ত কাজের সুযোগ, শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়, তবে সেই দেশ অভাবনীয় অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করতে পারে। অর্থাৎ জনসংখ্যা হতে পারে এক বিশাল সম্পদ। 


বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই তত্ত্ব কার্যকর করতে হলে প্রথমেই নজর দিতে হবে শ্রমশক্তির দক্ষতার দিকে। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চীনে দক্ষ শ্রমিকের হার ২৪ শতাংশ, আমেরিকায় ৫২, ইংল্যান্ডে ৬৮, জাপানে ৮০, ভারতে ৩ শতাংশ, আর বাংলাদেশ এখনো শূন্যের কোঠায়। একই সঙ্গে শিক্ষানীতিতে পরিবর্তন এনে কর্মমুখী শিক্ষা চালু করতে হবে।


নারী শ্রমশক্তির অপ্রতুলতা বাংলাদেশে একটি বড় সমস্যা। কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং ধর্মীয় প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। পোশাকশিল্পে নারীদের উপস্থিতি থাকলেও অন্যান্য খাতে তারা এখনো পিছিয়ে। রাষ্ট্রকে অবশ্যই নারীদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র তৈরি করতে হবে এবং কর্মসংস্থানে তাদের সম্পৃক্ত করতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন নারীদের উপযোগী কর্মসংস্থানের পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা।রাষ্ট্রকে তাই বৈষম্যহীন উন্নয়নের পথ বেছে নিতে হবে।


শুধু শ্রমশক্তি নয়, দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদনেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। ক্ষুদ্র, মাঝারি ও অতি ক্ষুদ্র শিল্পক্ষেত্রে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনায় সাফল্য পেতে হলে জনসচেতনতা তৈরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবার পরিকল্পনা, মা ও শিশুর স্বাস্থ্য, নারী শিক্ষা, পুষ্টি, বাল্যবিবাহ রোধ এবং লিঙ্গসমতা বিষয়গুলো নিয়ে ব্যাপক প্রচার ও কার্যকর কর্মসূচি নিতে হবে। জাতীয় পর্যায়ে জনসংখ্যাবিষয়ক একটি সর্বজনগ্রাহ্য নীতি প্রণয়ন জরুরি। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, অর্থনীতি ও পরিবেশ সব ক্ষেত্রেই জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।


সবশেষে বলা যায়, জনসংখ্যা একদিকে যেমন আমাদের জন্য সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছে, অন্যদিকে সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকলে তা পরিণত হচ্ছে ভয়াবহ সংকটে। রাষ্ট্রের সদিচ্ছা, সুনির্দিষ্ট নীতি এবং সম্মিলিত উদ্যোগই পারে এই বিপুল জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশের উন্নয়নের চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে।

                        (পিআইডি ফিচার)  

###


লেখক: উপ-প্রধান তথ্য অফিসার, আঞ্চলিক তথ্য অফিস ,বরিশাল।

এই বিভাগের আরো খবর

অনলাইন ভোট

খবর সরাসরি ইনবক্সে পেতে চান?