একদিন পরই বাতিল হিসাবরক্ষক হাসানের বদলির আদেশ
যেসব অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে
প্রতিনিধি,পটুয়াখালী।
পটুয়াখালীর ২৫০ শয্যা হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মো. হাসানুজ্জামানের বদলির আদেশ দেওয়ার এক দিন পরই তা বাতিল করা হয়েছে। গত ১১ আগস্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমী স্বাক্ষরিত এক আদেশে তাঁকে বরগুনা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে হিসাব রক্ষক পদে বদলি করা হয়। পরদিন ১২ আগস্ট একই কর্মকর্তার স্বাক্ষরিত আরেক আদেশে ওই বদলি বাতিল করা হয়।
বদলির আদেশে বলা হয়েছিল,জনস্বার্থে হাসানুজ্জামানকে বদলি করা হয়েছে। তাঁকে বর্তমান কর্মস্থল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে তিন কার্যদিবসের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়। আদেশে আরও বলা হয়, যথাযথ কর্তৃপক্ষের নির্দেশক্রমে এ আদেশ জারি করা হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে নতুন কর্মস্থলে যোগদান না করলে চতুর্থ কর্মদিবসে তিনি বর্তমান কর্মস্থল থেকে সরাসরি অব্যাহতি পেয়েছেন বলে গণ্য হবেন। তবে ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একই কর্মকর্তার স্বাক্ষরে বদলি ও তা বাতিলের পৃথক আদেশ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে বদলির আদেশ দেওয়া ও বাতিল করা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ রুমীর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তা বন্ধ পাওয়া যায়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাসের মুঠোফোনে কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সরদার মো. সখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
সাংবাদিককে মারধরের অভিযোগ
হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১৫ জুন দুপুরে এশিয়া পোস্ট অনলাইন পোর্টালের পটুয়াখালী প্রতিনিধি রাকিবুল ইসলাম তনু ও তাঁর সহকর্মী দীপ চন্দ্র শীল তথ্য সংগ্রহের জন্য পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালের হিসাবরক্ষক মো. হাসানুজ্জামানের কক্ষে যান। অভিযোগ, সেখানে হাসানুজ্জামানসহ হাসপাতালের কয়েকজন কর্মচারী তাঁদের কক্ষে আটকে মারধর করেন। এতে সাংবাদিক তনু ও তাঁর সহকর্মী আহত হন।
এ ঘটনায় পটুয়াখালী সদর থানায় লিখিত এজাহার দেওয়া হলেও পুলিশ মামলা গ্রহণ করেনি বলে অভিযোগ করেন তনু। পরে গত ১১ জুলাই তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনলাইনে লিখিত অভিযোগ করেন। ওই অভিযোগের তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের যুগ্মসচিব ফারজানা মান্নান। তবে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা এখন পর্যন্ত তাঁর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ করেননি বলে দাবি করেন তনু।
সাংবাদিক রাকিবুল ইসলাম তনু বলেন,‘তাঁর ওপর হামলার ঘটনায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করার পর হাসানুজ্জামানকে বদলি করা হয়েছিল। পরে রাজনৈতিক প্রভাবে এক দিনের মধ্যে সেই বদলি বাতিল করে তাঁকে আগের কর্মস্থলে বহাল করা হয়েছে।
বদলির খবরে ভুক্তভোগীদের আনন্দ মিছিল
হাসানুজ্জামানের বদলির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর তাঁর মাধ্যমে বিভিন্ন সময়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ করা প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আনন্দ মিছিল করেছেন। গত বুধবার দুপুরে পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতাল ক্যাম্পাসে ওই মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। মিছিল থেকে ভুক্তভোগীরা হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনায় আটকের অভিযোগ
হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে ২০২২ সালের একটি মাদক মামলার ঘটনায়ও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ১১০টি ইয়াবাসহ সদর থানা-পুলিশ তাঁকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। পরে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে। এরপর উদ্ধার হওয়া মাদকের সঙ্গে মাসুম গাজীসহ তিনজনের সংশ্লিষ্টতা দেখিয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করে কারাগারে পাঠানো হয়।
তবে পরে ওই মামলায় মাসুম গাজীসহ তিনজনকে ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর পটুয়াখালীর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত অব্যাহতি দেন। জানা যায়, ভুক্তভোগী মাসুম গাজী এর আগে হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেছিলেন।
হাসপাতালের বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালের বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ পাওয়া ১ কোটি ১৫ লাখ ৮৭ হাজার টাকা ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে হিসাবরক্ষক হাসানুজ্জামান ও তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে।
এ ঘটনায় স্থানীয় ঠিকাদার মো. কুদ্দুসুর রহমান ২০১৯ সালের ২৫ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয় ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি জেলা দুদক কার্যালয়ের তৎকালীন উপসহকারী পরিচালক মো. আরিফ হোসেন তদন্ত করে অভিযুক্তদের দায়মুক্তি দেন বলে অভিযোগে রয়েছে।
পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৫ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে এ অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনের সূত্র ধরে ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর দুদক প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশে জেলা দুদক কার্যালয় ইনফোর্সমেন্ট অভিযান চালায়।
অভিযোগকারীর দাবি, ওই অভিযানের সময় অভিযুক্ত ব্যক্তিরা বরাদ্দের তথ্য গোপন করে ভুয়া বিল-ভাউচার উপস্থাপন করেন। বিষয়টি জেলা দুদকের তৎকালীন উপপরিচালক মো. মামুন চৌধুরীর নজরে আনা হলেও তিনি তা আমলে না নিয়ে ঢাকায় প্রতিবেদন পাঠান এবং পরে বিস্তারিত তদন্ত করার কথা জানান।
একাধিক তদন্তের তথ্য
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে একাধিক তদন্তের আদেশ দেওয়া হয়। ২০২০ সালের ৬ অক্টোবর বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের তৎকালীন পরিচালক ডা. বাসুদেব কুমার দাস তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করেন। একই বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ডা. মো. বেলাল হোসেনের আদেশে বরগুনার তৎকালীন সিভিল সার্জনও তদন্ত করেন।
এ ছাড়া ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর পটুয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করেন। ২০১৮ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের তৎকালীন পরিচালক ডা. মো. মাহবুবুর রহমানের আদেশে পটুয়াখালী সদর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের তৎকালীন কর্মকর্তা ডা. লোকমান হাকিম তদন্ত করেন।
২০১৬ সালের ৭ মার্চ পটুয়াখালীর সিভিল সার্জনের নির্দেশে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তাঁর বিরুদ্ধে তদন্ত করেন। একই ভাবে ২০২০ সালের ৫ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ মোহাম্মদ হাসান ইমামের স্বাক্ষরিত আদেশে বরগুনার সিভিল সার্জনকেও তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চাকরি স্থায়ীকরণের আশ্বাসে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, ২০২১ সালের দিকে পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত প্রায় ৩০ জন নারী-পুরুষের চাকরি স্থায়ীকরণের আশ্বাস দিয়ে হাসানুজ্জামান মোটা অঙ্কের টাকা নেন। পরে চাকরি স্থায়ীকরণ না হওয়া এবং টাকা ফেরত না পাওয়ায় ভুক্তভোগীরা ২০২২ সালের ৫ জানুয়ারি মানববন্ধন করেন। একই বছরের ৬ জুন তাঁরা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন।
ভুক্তভোগীদের একজন মাসুম গাজী বলেন,‘ওই অভিযোগের ঘটনায় বরিশালের তৎকালীন সিভিল সার্জন অভিযোগকারীদের কোনো নোটিশ না দিয়ে গোপনে তদন্ত করেন। পরে বরিশালের তৎকালীন সিভিল সার্জন ডা. মারিয়া হাসান অভিযুক্ত ব্যক্তিকে নির্দোষ উল্লেখ করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে তদন্ত প্রতিবেদন পাঠান বলে জানা যায়।
কলাপাড়া ও গলাচিপায় দায়িত্ব পালনকালেও অভিযোগ
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়,২০১২ সালের দিকে কলাপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাবরক্ষক থাকাকালে হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম এবং এক নারী সহকর্মীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ ওঠে। ওই বছরের ২২ জুলাই স্থানীয় সাইদুর রহমান নামে এক ব্যক্তি তৎকালীন পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী মাহাবুবুর রহমানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে ২৯ জুলাই পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. আব্দুর রহিম হাসানুজ্জামানকে অভিযুক্ত করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া ২০১৮ সালের দিকে গলাচিপা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের হিসাব রক্ষক থাকাকালে সরকারি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। ওই বছরের ২৫ জুলাই ১০ জন ভুক্তভোগী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ারের পরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে একই বছরের ১১ সেপ্টেম্বর কমিউনিটি বেইজড হেলথ কেয়ার প্রশাসন ও অর্থ বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মাসুদ রেজা কবীরের নির্দেশে পটুয়াখালীর তৎকালীন সিভিল সার্জন অভিযোগটি তদন্ত করেন।
১৮ বছর ধরে একই ঠিকাদারকে কাজ দেওয়ার অভিযোগ
পটুয়াখালী ২৫০ শয্যা হাসপাতালে রোগীদের খাবার সরবরাহের দরপত্র দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রাখার অভিযোগও রয়েছে হাসানুজ্জামান ও হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. দিলরুবা ইয়াসমিন লিজার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ২০২৪ সালের ১ জুলাই মো. আবুল কালাম নামে এক ব্যক্তি পটুয়াখালী জেলা দুদক কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ করেন।
দুদকে দেওয়া অভিযোগে বলা হয়, কোনো দরপত্র ছাড়াই ১৮ বছর ধরে শহিদুল ইসলাম নামে একই ঠিকাদারকে হাসপাতালের রোগীদের খাবার সরবরাহের কাজ দেওয়া হচ্ছে।
অভিযোগ গুলোর বিষয়ে তদন্তের দাবি
বিভিন্ন সময়ে দেওয়া অভিযোগ, তদন্তের আদেশ ও প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বড় একটি অংশ সরকারি বরাদ্দের অর্থ আত্মসাত, আর্থিক অনিয়ম, চাকরি স্থায়ীকরণের আশ্বাসে টাকা নেওয়া এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়ম সংক্রান্ত।
একাধিক অভিযোগের ঘটনায় তদন্ত ও বদলির বিষয়ে হাসানুজ্জামান মুঠোফোনে বলেন,‘কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছায় বদলির আদেশ দেন এবং পরে তা বাতিলও করেন। বিগত দিনে একাধিক ঘটনায় তদন্ত হওয়ার বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি অসুস্থ বলে কলটি কেটে দেন। পরে তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা যায়নি।
সাংবাদিক নির্যাতনের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে দেওয়া লিখিত অভিযোগ এবং একাধিক তদন্তের পরও হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ তুলে ভুক্তভোগীরা নতুন করে সব অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে এক দিনের ব্যবধানে বদলি ও বদলি বাতিলের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্বচ্ছ ব্যাখ্যাও দাবি করেছেন তাঁরা।