সৌদিতে মৃত্যুদণ্ডের ঘটনায় দূতাবাসের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন, জবাব দেবে কে?
সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর প্রবাসীদের সুরক্ষা এবং বিপদে পড়া নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিজ দেশের নাগরিকদের আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং মৃত্যুদণ্ডের মতো গুরুতর সাজা ঠেকাতে সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা। একই সঙ্গে বিদেশে আটক বাংলাদেশিদের আইনি সহায়তা ও দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে সৌদি আরবের রিয়াদে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত ১০ অক্টোবরের হামলায় নিহত বাংলাদেশি শ্রমিক শাহেদ আহমেদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। গতকাল শুক্রবার সকাল ৮টা ৩৫ মিনিটে মরদেহবাহী উড়োজাহাজটি ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। তবে শাহেদের মরদেহ দেশে ফেরার খবরের পাশাপাশি সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বন্দি সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশির ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
শাহেদের মরদেহ গ্রহণ করেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। তিনি জানান, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত প্রচেষ্টায় দ্রুত মরদেহটি দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর এ পর্যন্ত ১০ জন প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনা হয়েছে। শাহেদ এ তালিকার ১১তম ব্যক্তি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৌদি আরবে ৪০ লাখের বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। ফলে দেশটিতে কোনো ঘটনা ঘটলে বাংলাদেশ সরকার গভীরভাবে উদ্বিগ্ন থাকে। শাহেদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে পরিবারটিকে ৫০ হাজার টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিতে বিনা মূল্যে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, ওই দুই ব্যক্তির বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে সরকার আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। তবে তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার আগে কী ধরনের আইনি ও কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেসব উদ্যোগের ফলাফল কী ছিল এবং সাজা ঠেকানোর কোনো সুযোগ ছিল কি না—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি দেশের নিজস্ব বিচারব্যবস্থা রয়েছে। আটক ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনতে অনেক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ওই দুই বাংলাদেশির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি ২০২৩ সালে ঘটেছিল।
তবে কেবল আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো বা বিচারব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করেই দায়িত্বের বিষয়টি শেষ হয়ে যায় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিদেশে কোনো বাংলাদেশি গুরুতর অপরাধের মামলায় আটক হলে তাঁর আইনজীবী নিয়োগ, বিচারপ্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সম্ভাব্য দণ্ড লাঘবে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার ক্ষেত্রে দূতাবাস ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা কতটা কার্যকর—তা স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
বিদেশে আটক বা বিপদে পড়া নাগরিকদের সুরক্ষায় নিজ নিজ দেশের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে আলোচনায় শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের দেশে ফেরানোর বিষয়টিও সামনে এসেছে। শ্রীলঙ্কার নাগরিকদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতার সঙ্গে বাংলাদেশের উদ্যোগের তুলনা টেনে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
তবে দুই দেশের ঘটনা, আইনি পরিস্থিতি এবং দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া এক কি না, তা যাচাই করা জরুরি। তারপরও এ তুলনা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনেছে—বিদেশে বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের সুরক্ষায় সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা দ্রুত, সমন্বিত ও ফলপ্রসূ?
বিশেষ করে মৃত্যুদণ্ডের মতো চূড়ান্ত শাস্তির ক্ষেত্রে সময়মতো আইনি সহায়তা, সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ এবং দণ্ড লাঘবের সম্ভাব্য পথ খুঁজে দেখার গুরুত্ব অনেক বেশি। এসব ক্ষেত্রে দূতাবাসের ভূমিকা ও সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা হলে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের জবাব পাওয়া সহজ হবে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবের বিভিন্ন কারাগারে বর্তমানে সাত হাজার ৫০০ বাংলাদেশি বন্দি রয়েছেন। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশির কারাবন্দি থাকার তথ্য প্রবাসীদের আইনি সুরক্ষা ও কনস্যুলার সহায়তা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে।
কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের সাজা হওয়ার খবর মন্ত্রণালয় জানতে পারলে তাঁকে রক্ষার উপায় খুঁজতে দ্রুত চেষ্টা শুরু করা হয় বলে জানিয়েছেন শামা ওবায়েদ। তবে বন্দিদের মধ্যে কতজন বিচারাধীন, কতজন সাজাপ্রাপ্ত, কতজনের বিরুদ্ধে গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে এবং কতজনকে দেশে ফিরিয়ে আনার সুযোগ আছে—এসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হলে পরিস্থিতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেত।
সৌদি আরবে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মরত থাকায় তাঁদের আইনি সহায়তা নিশ্চিত করতে দূতাবাসের সক্ষমতা, বন্দিদের নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশিদের গন্তব্য দেশের আইন ও বিধিবিধান সম্পর্কে আগেই জানার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। বিদেশে কর্মী নিয়োগের ব্যয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দালালদের কারণে অভিবাসী কর্মীদের খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে নির্দেশ দিয়েছেন।
প্রবাসীদের নিরাপত্তা, আইনি সুরক্ষা ও অভিবাসন ব্যয়—এই তিনটি বিষয় এখন বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। একদিকে বিদেশে কর্মরত লাখো মানুষের জীবন ও জীবিকা, অন্যদিকে বিদেশের কারাগারে বন্দি হাজারো নাগরিকের আইনি ভবিষ্যৎ। এসব ক্ষেত্রে কেবল ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া জানানো নয়, বরং আগাম সতর্কতা, কার্যকর কনস্যুলার সহায়তা এবং ফলাফলভিত্তিক কূটনৈতিক উদ্যোগ কতটা জোরদার করা হচ্ছে, তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
শাহেদ আহমেদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা সরকারের সমন্বিত উদ্যোগের একটি উদাহরণ। কিন্তু সৌদি আরবের কারাগারে বন্দি সাড়ে সাত হাজার বাংলাদেশি এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় তৈরি হওয়া প্রশ্নগুলোও সমান গুরুত্ব দাবি করে। বিদেশে বিপদে পড়া নাগরিকদের পাশে দাঁড়ানোর ক্ষেত্রে সরকারের উদ্যোগ, সীমাবদ্ধতা ও সাফল্যের বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশই এ নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া সংশয় দূর করতে সহায়ক হতে পারে।